স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও চিকিৎসা ঋণের চাপে প্রতি তিনজন কর্মক্ষম আমেরিকানের প্রায় একজন
স্বাস্থ্যবিমা থাকার পরও চিকিৎসা ঋণে জর্জরিত লাখো আমেরিকান; সঞ্চয় ভাঙছেন অনেকে, কেউ আবার খরচের ভয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পিছিয়ে দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও চিকিৎসা ঋণের চাপে প্রতি তিনজন কর্মক্ষম আমেরিকানের প্রায় একজন
যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যবিমা থাকলেই যে চিকিৎসার খরচ নিয়ে আর্থিক দুশ্চিন্তা থাকবে না—নতুন এক জরিপে তার বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে। বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় থাকা কর্মক্ষম বয়সী আমেরিকানদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসা বিল বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত ঋণ দীর্ঘ সময় ধরে পরিশোধ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা সংস্থা কমনওয়েলথ ফান্ড-এর নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯ থেকে ৬৪ বছর বয়সী এবং টানা ১২ মাস বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ৩২ শতাংশ চিকিৎসা বিল বা ঋণ কিস্তিতে কিংবা সময় নিয়ে পরিশোধ করছেন। অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিমা থাকার পরও প্রতি তিনজনের প্রায় একজনকে চিকিৎসা ব্যয়ের ঋণ বহন করতে হচ্ছে।
তবে এই পরিসংখ্যানকে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। গবেষণাটি মূলত ১৯–৬৪ বছর বয়সী বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমাধারীদের ওপর কেন্দ্রীভূত। তাঁদের বিমা ছিল নিয়োগকর্তার মাধ্যমে, অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের মার্কেটপ্লেস অথবা ব্যক্তিগত বিমাবাজার থেকে নেওয়া।
চিকিৎসা ঋণের পরিমাণও অনেক পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য। ঋণ বা চিকিৎসা বিল পরিশোধ করছেন এমন ব্যক্তিদের ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের বকেয়া ২ হাজার ডলার বা তার বেশি। গবেষকদের হিসাবে এর অর্থ বেসরকারি বিমা থাকা কর্মক্ষম বয়সী সব প্রাপ্তবয়স্কের আনুমানিক ১৫ শতাংশের চিকিৎসা ঋণ অন্তত ২ হাজার ডলার।
চিকিৎসা বিলের প্রভাব শুধু ব্যাংক হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ঋণ থাকা ব্যক্তিদের ৩৭ শতাংশ চিকিৎসা বিল মেটাতে তাঁদের সঞ্চয়ের কিছু অংশ অথবা পুরো সঞ্চয় খরচ করেছেন।
একই সঙ্গে ৩০ শতাংশ জানিয়েছেন, ঋণের কারণে তাঁরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন অথবা চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে গেছেন। আরও ৩০ শতাংশ খাবার, ঘর গরম রাখার খরচ কিংবা বাড়িভাড়ার মতো মৌলিক প্রয়োজনের ব্যয় কমিয়েছেন।
ঋণের মানসিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। বকেয়া চিকিৎসা বিল থাকা মানুষের ৬৮ শতাংশ জানিয়েছেন, এই ঋণ তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। কমনওয়েলথ ফান্ড বলছে, চিকিৎসা ঋণের আর্থিক চাপ অনেকের পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করছে।
সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা ঋণের উৎস হিসেবে উঠে এসেছে হাসপাতালসেবা। ঋণ পরিশোধ করছেন এমন ব্যক্তিদের ৬৪ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের ঋণের অন্তত একটি উৎস হাসপাতালের ইনপেশেন্ট, আউটপেশেন্ট অথবা জরুরি বিভাগের চিকিৎসা।
তবে শুধু বড় অস্ত্রোপচার কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণেই ঋণ তৈরি হচ্ছে না। চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নেওয়াকে ঋণের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৪৩ শতাংশ এবং ল্যাব পরীক্ষা বা ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার কথা বলেছেন ৩৮ শতাংশ। দাঁতের চিকিৎসাকেও ঋণের উৎস বলেছেন ২৫ শতাংশ। একজন উত্তরদাতা একাধিক উৎস উল্লেখ করতে পেরেছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৬ শতাংশ বলেছেন, হঠাৎ ১ হাজার ডলারের চিকিৎসা বিল এলে তাঁরা ৩০ দিনের মধ্যে সেটি পরিশোধ করতে পারবেন না। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে এই আর্থিক ঝুঁকি আরও বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
চিকিৎসা ঋণের বোঝা সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমান নয়। বেসরকারি বিমা থাকা কৃষ্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের ৪১ শতাংশ চিকিৎসা ঋণ পরিশোধ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে হার ৩৯ শতাংশ। হিস্পানিক এবং নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে হার ৩৮ শতাংশ করে। নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ঋণ থাকার হার পাওয়া গেছে ৩৭ শতাংশ।
ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াতেও অনেক মানুষকে তৃতীয় পক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অধিকাংশ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি চিকিৎসক, হাসপাতাল, ডেন্টিস্ট বা অন্য চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীকে সরাসরি অর্থ দিচ্ছেন। তবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঋণ আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পরিশোধ করছেন। প্রায় একই অনুপাতে উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসা বিল বা ঋণের তথ্য ক্রেডিট ব্যুরোতে পাঠানো হয়েছে।
কমনওয়েলথ ফান্ড-এর গবেষণার প্রধান লেখক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ সারা কলিন্স সিবিএস নিউজ-কে বলেছেন, মানুষ কেন চিকিৎসা ঋণে পড়ছেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিমা থাকার পরও তাঁদের নিজেদের পকেট থেকে কতটা খরচ বহন করতে হচ্ছে। তাঁর মতে, অপ্রত্যাশিত চিকিৎসা ব্যয় এমন সময়ে সামনে আসতে পারে যখন একটি পরিবারের আয়ের প্রায় পুরোটাই অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ থাকে। তখন চিকিৎসা বিল পারিবারিক বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
জরিপে চিকিৎসা ঋণ পরিশোধকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই পরিস্থিতির জন্য তাঁরা কাদের দায়ী মনে করেন। ৬৪ শতাংশ বিমা কোম্পানিকে এবং ৫৭ শতাংশ সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। এক-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা সরকারকেও দায়ী করেছেন। এগুলো জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতামত, গবেষকদের স্বাধীন দায় নির্ধারণ নয়।
গবেষণাটি কমনওয়েলথ ফান্ড-এর ২০২৫ সামর্থ্য বিষয়ক জরিপ-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৫ সালের ২২ জুলাই থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ১৯ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ৬,৩৫৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
তবে বর্তমান প্রতিবেদনের মূল বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৪,১২১ জনকে, যাঁরা জরিপের সময় এবং তার আগের টানা ১২ মাস বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় ছিলেন। এই নমুনাকে প্রায় ১১ কোটি ৫২ লাখ বেসরকারি বিমাধারী কর্মক্ষম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ওজন দেওয়া হয়েছে। এই উপনমুনার ফলাফলের নমুনাগত ত্রুটিসীমা ৯৫ শতাংশ আস্থাস্তরে প্রায় প্লাস-মাইনাস ১.৮ শতাংশ পয়েন্ট।
গবেষকেরা জরিপের পাশাপাশি চিকিৎসা ঋণ, বিলিংয়ের ভুল এবং বিমা দাবি প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা জানতে বেসরকারি বিমা থাকা ৪৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে আটটি অনলাইন ফোকাস গ্রুপও পরিচালনা করেন। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, নতুন ঋণের আশঙ্কায় তাঁরা চিকিৎসা বা পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়েছেন; আবার কেউ অতিরিক্ত কাজ করে চিকিৎসা বিল পরিশোধের চেষ্টা করেছেন।
গবেষণাটি এমন এক বাস্তবতা সামনে আনছে যেখানে স্বাস্থ্যবিমা থাকা এবং চিকিৎসা ব্যয় বহনের সক্ষমতা এক বিষয় নয়। বিমা চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ বহন করলেও ডিডাক্টিবল, কো-পেমেন্ট, কো-ইনস্যুরেন্স, কাভারেজ প্রত্যাখ্যান এবং অন্যান্য নিজস্ব ব্যয় অনেক পরিবারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
কমনওয়েলথ ফান্ড-এর গবেষকেরা চিকিৎসা ঋণ কমাতে হাসপাতালের আর্থিক সহায়তার নিয়ম শক্তিশালী করা, রোগীদের সেই সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং চিকিৎসা ঋণ আদায় ও ক্রেডিট রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে সুরক্ষা বাড়ানোর মতো নীতিগত পদক্ষেপের কথা তুলেছেন। এগুলো গবেষণা প্রতিবেদনের নীতিগত প্রস্তাব; কার্যকর নীতি নিয়ে সরকার, বিমা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পক্ষের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে।
নতুন জরিপটি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষম বয়সী বহু মানুষের জন্য বড় চিকিৎসা বিল পারিবারিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। কারও সঞ্চয় শেষ হচ্ছে, কেউ মৌলিক খরচ কমাচ্ছেন, আবার কেউ নতুন বিলের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পিছিয়ে দিচ্ছেন।