একদিকে আইসিইর আটক, অন্যদিকে অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ!
সেনা সদস্যদের স্বজনদেরও আটক ও বহিষ্কার করছে আইসিই, একই সময়ে গ্রিন কার্ডধারী অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বাড়াচ্ছে পেন্টাগন।
একদিকে আইসিইর আটক, অন্যদিকে অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ!
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং সামরিক বাহিনীতে অভিবাসীদের নিয়োগ—দুটি বিষয়কে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এবিসি নিউজের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্রিয় সদস্যদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ কর্তৃপক্ষ আটক বা বহিষ্কার করেছে। একই সময়ে প্রতিরক্ষা দপ্তর বৈধ স্থায়ী বাসিন্দাসহ অভিবাসী সম্প্রদায় থেকে সামরিক বাহিনীতে সদস্য নেওয়ার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত জেসমিন হার্নান্দেজের বাবা আনিচেতো হার্নান্দেজ-রেইনা এ বছর অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন। হার্নান্দেজ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগে তার বাবাকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সামরিক সদস্যদের পরিবারের নির্দিষ্ট স্বজনদের জন্য থাকা একটি অভিবাসন কর্মসূচির আওতায় আবেদন করেছিলেন। তারপরও তার বাবা আটক হন এবং বর্তমানে অ্যারিজোনার একটি আটককেন্দ্রে রয়েছেন বলে এবিসি নিউজ জানিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা সামরিক পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সামরিক বাহিনীতে কর্মরত একজন সদস্য দেশের হয়ে দায়িত্ব পালন করলেও তার পরিবারের কোনো সদস্যের অভিবাসন-সংক্রান্ত পুরোনো মামলা থাকলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে।
এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি প্রশাসনের সময়ে সামরিক সদস্যদের ৫০ জনের বেশি স্বামী, স্ত্রী বা বাবা-মাকে আটক করা হয়েছে বলে এপ্রিলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল। তাদের মধ্যে অন্তত ছয়জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর অভিবাসী সম্প্রদায় থেকে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বাড়াচ্ছে। বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিন কার্ডধারীরাও নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করলে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। অভিবাসী জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ বাড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জনবল কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি বিশেষ পথও রয়েছে। এবিসি নিউজের পর্যালোচনা করা মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া সদস্যের সংখ্যা ২০২০ সালের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৬ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য নাগরিকত্ব পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আরেকটি আলোচিত ঘটনা হলো অ্যানি রামোসের ঘটনা। হন্ডুরাসে জন্ম নেওয়া রামোস মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সদস্যকে বিয়ে করার কয়েকদিন পর লুইজিয়ানার একটি সামরিক ঘাঁটিতে সামরিক সুবিধার জন্য নিবন্ধন করতে গেলে আইসিই তাকে আটক করে। তার বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের একটি বহিষ্কার আদেশ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২০ মাস। পরে পাঁচ দিন আটক থাকার পর তাকে গোড়ালিতে পরার নজরদারি যন্ত্রের শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।
এই ঘটনাগুলো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে—মার্কিন সামরিক সদস্যের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিবাসন মামলার সব ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। ব্যক্তির নিজস্ব অভিবাসন ইতিহাস, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি অবস্থার ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, দপ্তর আইনের শাসন এবং আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের প্রতি সম্মান রাখে। অর্থাৎ সামরিক সদস্যদের পরিবারের অভিবাসন মামলা এবং সামরিক বাহিনীর নিয়োগ কার্যক্রমকে মার্কিন প্রশাসন আলাদা আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অনেক পরিবারের কোনো সদস্য বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা, কেউ নাগরিক, আবার অন্য কোনো সদস্যের অভিবাসন আবেদন বা মামলা চলমান থাকতে পারে। পরিবারের একজন সামরিক বাহিনীতে থাকলেও অন্য সদস্যের অভিবাসন পরিস্থিতি আলাদাভাবে মূল্যায়িত হতে পারে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেই পরিবারের সবাই অভিবাসন সুরক্ষা পাবে’—এ ধরনের সাধারণ দাবি সঠিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। একইভাবে কোনো সামরিক পরিবারের সদস্যকে আটক করা মানেই তিনি অপরাধ করেছেন—এমন দাবিও প্রমাণ ছাড়া করা ঠিক হবে না।
বর্তমান ঘটনাগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নীতির পাশাপাশি চলার বিষয়টি সামনে এনেছে—একদিকে অভিবাসন আইন প্রয়োগ জোরদার করা হচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর জনবল বাড়াতে অভিবাসী সম্প্রদায়ের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে তৈরি হওয়া পারিবারিক ও আইনি জটিলতা আগামী দিনেও আলোচনায় থাকতে পারে।