ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত মার্কিন ঘাঁটির গোপন ছবি প্রকাশ, সৌদি-কুয়েতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি-কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, নতুন ছবিতে ধ্বংস হওয়া বিমান ও স্থাপনার ভয়াবহ চিত্র।

ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত মার্কিন ঘাঁটির গোপন ছবি প্রকাশ, সৌদি-কুয়েতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে

ইরানের হামলায় বিধ্বস্ত মার্কিন ঘাঁটির গোপন ছবি প্রকাশ, সৌদি-কুয়েতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে


মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির নতুন চিত্র সামনে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের হাতে আসা কয়েকটি ছবিতে সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিমান, ছিন্নভিন্ন সামরিক ট্রেইলার, বিধ্বস্ত অবকাঠামো এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখা গেছে। ছবিগুলো সক্রিয় মার্কিন সামরিক সদস্যরা সিবিএসকে দিয়েছেন এবং তারা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।


সিবিএসের প্রকাশিত ছবিগুলোর মধ্যে একটি ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজ, ছিন্নভিন্ন সামরিক ট্রেইলার এবং হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা দেখা যায়। সামরিক সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ছবি সৌদি আরব ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবস্থান থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে ছবিগুলোর নির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রতিটি ছবির ক্ষয়ক্ষতি কোন নির্দিষ্ট হামলায় হয়েছে, সেটি আলাদাভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।


এই নতুন ছবিগুলো সামনে আসার সময়ই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পরিদর্শক-প্রতিবেদনে ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে জুন ২০২৬ সময়কালে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উড়োজাহাজ ও ড্রোন রয়েছে। মার্কিন সরকারি পরিদর্শক প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সাতটি কেসি-১৩৫ আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।


ইরানের হামলার প্রভাব শুধু সামরিক ঘাঁটির ভবন বা সরঞ্জামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরবরাহ কার্যক্রম অপেক্ষাকৃত দূরের দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরবরাহের সময় ও পরিচালনাগত জটিলতা বেড়েছে।


মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাও ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সরকারি প্রতিবেদনে চারটি দেশে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনায় প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হামলা ও সংঘাতের কারণে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিককে বিভিন্ন এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার জরুরি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে।

সিবিএসের সঙ্গে কথা বলা একজন সক্রিয় মার্কিন সামরিক সদস্য দাবি করেছেন, ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা সাধারণ মার্কিন জনগণের সামনে পুরোপুরি আসেনি। তিনি হামলার পর নিজেদের অবস্থাকে অত্যন্ত কঠিন বলে বর্ণনা করেছেন। তবে এটি একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সামরিক সদস্যের বক্তব্য; তাই তার মন্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের সমতুল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।

অন্যদিকে মার্কিন সরকারি হিসাব বলছে, ইরানের বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা দপ্তরের পরিদর্শক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে এবং এর ফলে উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের মজুত নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, মার্কিন সরকারি পরিদর্শক প্রতিবেদনে শুধু ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি নয়, উন্নত সামরিক গোলাবারুদের ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপের কথা উঠে এসেছে।

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মোট যুদ্ধ ব্যয়ও বড় আকার ধারণ করেছে। সরকারি পরিদর্শক প্রতিবেদনের হিসাবে এপ্রিল থেকে জুন সময়কালে সংঘাতসংক্রান্ত মার্কিন ব্যয় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর মধ্যে সামরিক অভিযান, গোলাবারুদ, সরঞ্জাম এবং অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।


তবে ক্ষয়ক্ষতির ছবিগুলো প্রকাশ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এখনো ওই অঞ্চলে বড় ধরনের বিমান, নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রেখেছে। বরং নতুন তথ্যগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মার্কিন ঘাঁটি, সরবরাহ ব্যবস্থা, সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।


এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় সৌদি আরব, কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইরানের হামলার পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।


সিবিএসের হাতে আসা নতুন ছবিগুলো এবং মার্কিন সরকারি পরিদর্শক প্রতিবেদনের তথ্য ইরানের হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির একটি তুলনামূলক বিস্তৃত চিত্র সামনে এনেছে। তবে ছবির প্রতিটি ক্ষতির উৎস, সময় ও হামলার ধরন আলাদাভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত দাবি থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য দিতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর