হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় সৌদি চাপে, লোহিত সাগরে বাড়ছে যুদ্ধের নতুন ঝুঁকি
ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় সৌদি আরব চাপে, বাব আল-মান্দাব ঘিরে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ঝুঁকি।
হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় সৌদি চাপে, লোহিত সাগরে বাড়ছে যুদ্ধের নতুন ঝুঁকি
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর সাম্প্রতিক দ্রুত সামরিক অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় একের পর এক কৌশলগত অবস্থান দখলের মাধ্যমে হুথিরা এখন বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক অভিযানে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে এবং হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও কৌশলগত অবস্থান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি বক্তব্যে হুথিদের ‘যোদ্ধা জাতি’, ইয়েমেনের ৩০ শতাংশের বেশি ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রক এবং সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিজয়ী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, বক্তব্যটির কিছু অংশ বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কিছু অংশ অতিরঞ্জিত বা মূল্যায়ননির্ভর। বিশেষ করে হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি ‘বড় সামরিক পরাজয়’ দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তমূলক দাবি করার মতো নিরপেক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুথিদের আলোচনার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। তারা মূলত উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন। ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির রাজনৈতিক সংকট দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। এর পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের পক্ষে সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রায় এক দশক ধরে চলা এই সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত করেছে।
হুথিদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। তাদের জায়দি শিয়া পরিচয় থাকলেও ইরানের প্রচলিত দ্বাদশ ইমামভিত্তিক শিয়া মতবাদের সঙ্গে তাদের ধর্মীয় মতাদর্শ পুরোপুরি অভিন্ন নয়। তাই হুথিদের শুধু ‘ইরানের শিয়া মিত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ হয়। তবে সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র ইরানের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার কথা জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দাবের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ পেরিম বা মায়ুনের নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, হুথিরা লোহিত সাগরের ইয়েমেনি উপকূলের কার্যত পুরো অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে এবং কৌশলগত অবস্থানগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করেছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এর উত্তরে রয়েছে সুয়েজ খাল। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে সামরিক সংঘাত বাড়লে শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার কারণে সৌদি আরবও নতুন করে সামরিক চাপের মুখে পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা সৌদি শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনে হুথি অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। ফলে ২০২২ সালের পর তুলনামূলকভাবে কমে আসা ইয়েমেনের সংঘাত আবার বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো তাদের পশ্চিমমুখী তেল পরিবহন ব্যবস্থা। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে সংকটের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি হুথিদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প সমুদ্রপথও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবের ওপর নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন হামলা অনুমোদন করেননি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। পরিবর্তে ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ১৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।
এখানেই ‘হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় পরাজয় দিয়েছে’—এই দাবিটির ফ্যাক্টচেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হুথিদের অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের জন্য অবশ্যই একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কিন্তু এটিকে সরাসরি মার্কিন সামরিক পরাজয় বলা তথ্যভিত্তিক হবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনো সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে এবং একই সময়ে হুথিদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও বজায় রেখেছে।
১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন কর্মকর্তারা ওমানে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হয়েছে বলে পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে। সেখানে হুথিরা মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজে হামলা না করার এবং ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৈঠকটির বিষয়ে সরাসরি নিশ্চিত করেনি।
অর্থাৎ একদিকে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও চলছে। এই দ্বৈত পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সৌদি আরবের ওপর চাপের আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো মক্কার কাছাকাছি একটি হুথি ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার সৌদি দাবি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, ড্রোনটি মক্কার সীমিত আকাশসীমার দিকে এগোচ্ছিল এবং সেটি ভূপাতিত করা হয়েছে। হুথিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন এবং হুথিদের দাবি করা অন্যান্য সামরিক সাফল্যের কিছু ঘটনাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের বিমান হামলা মোকাবিলা করে হুথিরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক সংগঠন আরও শক্তিশালী করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভৌগোলিক সুবিধা, স্থানীয় সমর্থন, সংগঠনের কাঠামো এবং ইরানের সামরিক সহায়তা হুথিদের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
তবে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার মানবিক মূল্যও দ্রুত বাড়ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এক লাখের বেশি ইয়েমেনি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেনে আশ্রয় নিয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সৌদি আরব বনাম হুথি সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার।