চীনের জন্য ট্রাম্পের নতুন বার্তা মার্কিন মাটিতে গাড়ি কারখানা খোলার দরজা খুলল
চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা খোলার অনুমতি দিতে প্রস্তুত ট্রাম্প, চাকরি সৃষ্টিকে দেখছেন বড় সুযোগ হিসেবে তবে আইনপ্রণেতাদের আপত্তি রয়েছে।
চীনের জন্য ট্রাম্পের নতুন বার্তা মার্কিন মাটিতে গাড়ি কারখানা খোলার দরজা খুলল
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কারখানা স্থাপন করে এবং সেখানে মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থান করে, তাহলে তিনি তাতে আপত্তি করবেন না। তাঁর এই বক্তব্যকে চীনের প্রতি একটি সম্ভাব্য সমঝোতার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি নতুন কোনো চুক্তি বা চীনা গাড়ি আমদানির অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, বক্তব্যটি মূলত ১০ সেপ্টেম্বর ডালাসে লরা ইনগ্রাহামের নেওয়া সাক্ষাৎকারের অংশ। সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশ ১০ সেপ্টেম্বর প্রচারিত হয় এবং দ্বিতীয় অংশ ১১ সেপ্টেম্বর প্রচারিত হয়। অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর প্রচারিত অংশের বিষয়ে বলা হলেও সাক্ষাৎকারটি আগের দিন নেওয়া হয়েছিল। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় প্রচারের তারিখকেই সাক্ষাৎকার নেওয়ার তারিখ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প জানান, চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রে এসে কারখানা স্থাপন করে গাড়ি তৈরি করতে চায়, তাহলে তিনি তাতে সম্মত হতে পারেন। তাঁর যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল কর্মসংস্থান। তিনি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি নির্মাতাদের উদাহরণ টেনে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা করলে স্থানীয় শ্রমিকদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চীনা গাড়ি তৈরির সম্ভাবনা এবং মেক্সিকোতে গাড়ি তৈরি করে তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর বিষয়কে এক করে দেখেননি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন করে সেখানেই গাড়ি তৈরি করলে তিনি বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখবেন। কিন্তু মেক্সিকোতে গাড়ি তৈরি করে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান একই নয়।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, গাড়ি এবং উৎপাদন খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। চীনা গাড়ি বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পমহলে উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির আইনপ্রণেতা এবং গাড়ি নির্মাতাদের একটি বড় অংশ চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে।
বর্তমানে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নীতি ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে কার্যকর হওয়া বাইডেন প্রশাসনের একটি বিধিনিষেধ চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রি বা উৎপাদনের ওপর কঠোর বাধা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর একশ শতাংশের বেশি শুল্ক রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বাস্তবে কার্যকর করতে হলে বিদ্যমান নীতি ও বিধিনিষেধের প্রশ্নও সামনে আসবে।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পের বড় সংগঠনগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। শিল্পমহলের আশঙ্কা, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বিপুল সরকারি সহায়তা, কম উৎপাদন ব্যয় এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করে, তাহলে দেশটির নিজস্ব গাড়ি নির্মাতারা কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
শুধু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতাই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আধুনিক গাড়িতে বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা থাকে। তাই চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রে বড় আকারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তথ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি প্রভাবের মতো বিষয়গুলো নিয়েও মার্কিন আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পের একটি অংশ চীনা গাড়ির প্রবেশ স্থায়ীভাবে সীমিত করার জন্য নতুন আইন করার পক্ষে চাপ দিচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে পুরোপুরি চীনের প্রতি নীতিগত ছাড় হিসেবে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যের মূল শর্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদন এবং মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থান। অর্থাৎ চীনা প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করার ধারণাটিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত বিদেশি বিনিয়োগকে মার্কিন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার একটি কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ট্রাম্পের এই অবস্থান তাঁর আগের চীনবিষয়ক কঠোর অবস্থানের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। তাঁর প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনা এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলে আসছে। কিন্তু এবার তিনি এমন একটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন যেখানে চীনা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই বিনিয়োগ করবে, কারখানা করবে এবং স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ করবে। ফলে এটি সরাসরি চীনের প্রতি নরম হয়ে যাওয়া না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ টেনে আনার নতুন দরকষাকষির কৌশলও হতে পারে।
এর মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজেই এমন গুঞ্জন অস্বীকার করেছেন যে তাঁর প্রশাসন কোনো বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে চীনা গাড়িকে অবাধে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকতে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যকে চীনা গাড়ির জন্য অবিলম্বে বাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা হিসেবে প্রচার করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দেশটির গাড়ি শিল্পে কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং বিদেশি প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। ট্রাম্প যদি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দিকে এগিয়ে যান, তাহলে একদিকে নতুন কারখানা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে দেশীয় গাড়ি নির্মাতাদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতাও আসতে পারে। বিশেষ করে চীনা রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে প্রতিযোগিতা অসম হতে পারে এমন আশঙ্কা ইতোমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে।
চীনের দিক থেকেও এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গাড়ি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল বাজারে সরাসরি উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ পেলে পরিবহন ব্যয় কমানো, স্থানীয় বাজারে অবস্থান তৈরি এবং মার্কিন শ্রমবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কারণে বাস্তবে এমন বিনিয়োগ কতটা সহজ হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে, ১১ সেপ্টেম্বর প্রচারিত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের বক্তব্যকে চীনের প্রতি সরাসরি নীতিগত আত্মসমর্পণ বা নতুন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা বলা ঠিক হবে না। বরং এটি চীনা গাড়ি নির্মাতাদের যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ। তাঁর শর্তও স্পষ্ট উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হতে হবে এবং এর মাধ্যমে মার্কিন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান তৈরি হতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যমান বিধিনিষেধ, উচ্চ শুল্ক, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং মার্কিন গাড়ি শিল্পের বিরোধিতা এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। তাই ট্রাম্পের বক্তব্যকে আপাতত একটি সম্ভাব্য নীতিগত ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা সবচেয়ে তথ্যভিত্তিক হবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।