দুই সন্তানের জন্য ক্যারিয়ার ছেড়েও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ালেন বাংলাদেশি-আমেরিকান কামরুন নাহার কান্তা

দুই সন্তানের জন্য ক্যারিয়ার ছাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি-আমেরিকান নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত কামরুন নাহার কান্তা।

দুই সন্তানের জন্য ক্যারিয়ার ছেড়েও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ালেন বাংলাদেশি-আমেরিকান কামরুন নাহার কান্তা

দুই সন্তানের জন্য ক্যারিয়ার ছেড়েও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ালেন বাংলাদেশি-আমেরিকান কামরুন নাহার কান্তা


পরিবারের প্রয়োজনে অনেক নারীকে জীবনের কোনো এক পর্যায়ে নিজের ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। বিশেষ করে সন্তানদের যত্ন, পরিবারের দায়িত্ব কিংবা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে অনেকের পেশাগত জীবন থেমে যায়। তবে ক্যারিয়ারে বিরতি মানেই যে জীবনের পথচলা থেমে যাবে—তারই অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশি-আমেরিকান কামরুন নাহার কান্তা।


১৯৭৭ সালে ঢাকায় জন্ম নেওয়া কামরুন নাহার কান্তা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ফ্রেমিংহ্যামে বসবাস করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি প্রথমদিকে সামারভিলে ছিলেন। বাংলাদেশে হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা কান্তার জীবনের গতিপথ বদলে যায় বিয়ের পর।

২০০৫ সালে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কুয়েতে চলে যান তিনি। সেখানে জন্ম হয় তাঁর দুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলের। সন্তানদের বাড়তি যত্ন ও নিয়মিত সহায়তার প্রয়োজন হওয়ায় নিজের চাকরি ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে। প্রায় আট বছর তিনি মূলত সন্তানদের দেখাশোনা ও পরিবারের দায়িত্বেই নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।


এই সময়টি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। একজন কর্মজীবী নারী থেকে পুরোপুরি পরিবারকেন্দ্রিক জীবনে চলে আসার পাশাপাশি দুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁকে প্রতিনিয়ত ভাবতে হয়েছে। তবে পরিস্থিতির কাছে থেমে না গিয়ে সন্তানদের প্রয়োজন বোঝার জন্য নিজেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।


কুয়েতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব কুয়েত থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ১৬টি পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন কান্তা। পাশাপাশি কুয়েত অ্যাসোসিয়েশন অব লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি এবং লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি প্যারেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে প্রায় ১০ থেকে ১২টি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেন।

পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০১৩ সালের শেষদিকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরের বছর, ২০১৪ সালের জুন থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সহকারী শিক্ষক হিসেবে পেশাগতভাবে কাজ শুরু করেন। নিজের সন্তানদের যত্ন নিতে গিয়ে অর্জিত জ্ঞানই ধীরে ধীরে তাঁর নতুন ক্যারিয়ারের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

এরপর আসে জীবনের আরেকটি বড় পরিবর্তন।


২০১৫ সালের ১ জুলাই স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান কামরুন নাহার কান্তা। নতুন দেশ, নতুন সমাজ ও নতুন কর্মপরিবেশে আবারও তাঁকে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করতে হয়।


যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর প্রথম বছর জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি রেস্তোরাঁয় অর্থ গ্রহণ ও সম্মুখসেবা বিভাগে কাজ করেন তিনি। একই সময়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টাও চালিয়ে যান। শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ ও হস্তক্ষেপসংক্রান্ত বিষয়ে অনলাইনে আরও ছয়টি পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীতে নিউটনের সরকারি বিদ্যালয়ব্যবস্থায় আচরণগত সহায়তা প্রদানকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পান। ২০১৬ সাল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।


তবে সন্তানদের প্রয়োজন আবারও তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে। ২০২২ সালে দুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলের দেখাশোনার জন্য নির্ভরযোগ্য সহায়তা না পাওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন কান্তা।

এটি ছিল তাঁর জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা। কিন্তু এবার তিনি আগের অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কীভাবে নিজের কর্মজীবনও চালিয়ে যাওয়া যায়—সেই পথ খুঁজতে শুরু করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের জুলাই মাসে অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করেন তিনি। চার বছরের বেশি সময় ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে বর্তমানে পরামর্শদাতা, সনদপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক এবং নিজের অনলাইন ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে কাজ করছেন কামরুন নাহার কান্তা।


নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মনে করেন, পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে অনেক যোগ্য মানুষ কর্মজীবন থেকে দূরে সরে যান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের বাবা-মা, ছোট সন্তানের অভিভাবক, বয়স্ক মা-বাবার পরিচর্যাকারী কিংবা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাইরে গিয়ে কাজ করতে না পারা ব্যক্তিদের জন্য ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কান্তার কাজের অন্যতম লক্ষ্য হলো—যাঁরা প্রচলিত কর্মজীবনের বাইরে চলে গেছেন, তাঁদের সামনে অনলাইনভিত্তিক কাজ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরা।

এ ছাড়া চাকরির পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজছেন, ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে চান, আগাম অবসরের পরিকল্পনা করছেন কিংবা নিজের সময় ও কাজকে নিজের মতো করে পরিচালনা করতে চান—এমন ব্যক্তিদেরও অনলাইন ব্যবসার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকেন তিনি।


কান্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত পরামর্শ, ওয়েব ঠিকানা, ব্যবসায়িক ই-মেইল, সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেন। প্রযুক্তিতে নতুনদের ধাপে ধাপে শেখানো এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা দেওয়াকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।

ঢাকায় হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে কুয়েতে দুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের মা হিসেবে নতুন দক্ষতা অর্জন, পরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে রেস্তোরাঁয় কাজ, সরকারি

বিদ্যালয়ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন এবং শেষ পর্যন্ত সন্তানদের জন্য চাকরি ছেড়ে অনলাইন উদ্যোক্তা—কামরুন নাহার কান্তার জীবনের প্রতিটি ধাপই নতুন করে শুরু করার গল্প।

তাঁর পথচলা দেখিয়েছে, পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ক্যারিয়ারে বিরতি এলেও একজন মানুষের দক্ষতা, স্বপ্ন ও আত্মপরিচয় শেষ হয়ে যায় না। বরং জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন ক্ষেত্রেও নিজের জন্য সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।


বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তান, পরিবার ও ক্যারিয়ারের ভারসাম্য রাখা অনেকের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতার মধ্যেই কান্তা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখাতে চাইছেন—পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং নিজের পেশাগত পরিচয় ধরে রাখার মধ্যে নতুন সমন্বয়ের পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এই বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্যদেরও নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ তৈরি করতে চান। তাঁর বার্তা—জীবনের কোনো পর্যায়ে থেমে যেতে হলেও সেটিকে শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই; শেখার আগ্রহ ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।


কামরুন নাহার কান্তার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাঁর ওয়েবসাইট www.kamrunnahar2.com এবং ব্যবসায়িক ই-মেইল [email protected] ব্যবহার করা যাবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর