ডাকযোগে ভোটে ট্রাম্পের নতুন নিয়ম আটকালেন দ্বিতীয় ফেডারেল বিচারক

ভোটের আগে ট্রাম্পের বড় পরিকল্পনায় ফের আদালতের বাধা! ডাকযোগে ভোটের নতুন নিয়ম কার্যকর করা থেকে মার্কিন ডাক বিভাগকে বিরত থাকতে বলেছেন দ্বিতীয় ফেডারেল বিচারক। প্রশাসনের আপিল ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের সামনে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে বড় আইনি লড়াই।

ডাকযোগে ভোটে ট্রাম্পের নতুন নিয়ম আটকালেন দ্বিতীয় ফেডারেল বিচারক

ডাকযোগে ভোটে ট্রাম্পের নতুন নিয়ম আটকালেন দ্বিতীয় ফেডারেল বিচারক


যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ডাকযোগে ভোটের নিয়ম পরিবর্তনের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে আবারও বাধা এসেছে ফেডারেল আদালত থেকে। ওয়াশিংটন ডিসির একজন ফেডারেল বিচারক মার্কিন ডাক বিভাগকে নতুন নিয়ম কার্যকর করা থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একই ধরনের আরেকটি নিষেধাজ্ঞা আগেই দিয়েছিলেন বোস্টনের একজন ফেডারেল বিচারক। 


রোববার রাতে ওয়াশিংটন ডিসির ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ কার্ল জে. নিকোলস নতুন নিয়মের ওপর প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা দেন। নিকোলসকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই। 


বিচারক নিকোলসের আশঙ্কা, নিয়মটি এখন কার্যকর হলে আসন্ন নির্বাচনে বৈধভাবে দেওয়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ডাকযোগের ভোট শেষ পর্যন্ত গণনায় না-ও আসতে পারে। নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কারণে ভোটারদের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেছেন তিনি।


বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন ডাক বিভাগের ২১ আগস্ট জারি করা নতুন নিয়ম। এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চলতি বছরের মার্চে দেওয়া নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নের অংশ। 


নতুন ব্যবস্থায় ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটের খামের নকশা আগে থেকেই মার্কিন ডাক বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি যেসব ভোটার ডাকযোগে ব্যালট পাবেন, তাদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য একটি অনলাইন ব্যবস্থায় জমা দিতে হবে অঙ্গরাজ্যগুলোকে। কিন্তু আদালতের নথি অনুযায়ী সেই অনলাইন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। 


এখানেই আপত্তি তুলেছেন নির্বাচনী কর্মকর্তা, নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং মামলাকারীরা। তাদের বক্তব্য, নির্বাচনের এত কাছে এসে নতুন ব্যবস্থা চালু করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। ভুল বা কারিগরি সমস্যার কারণে বৈধ ভোটারের ব্যালট আটকে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা। 


সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। ইতোমধ্যে আলাবামা, নর্থ ক্যারোলাইনা ও উইসকনসিনসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আরও রাজ্য দ্রুত একই প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে। 


এই মামলায় আদালতের অবস্থানও কয়েক মাসের মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে। গত মে মাসে বিচারক নিকোলস একই নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে রাজি হননি। তখন তিনি বলেছিলেন, নিয়মটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই মামলা করায় আদালতের হস্তক্ষেপের সময় আসেনি। 


এরপর ডাক বিভাগ বাস্তবায়নের বিস্তারিত নিয়ম প্রকাশ করলে মামলাকারীরা আবার আদালতে যান। এবার বিচারক মনে করেছেন, সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি আর শুধু অনুমানের পর্যায়ে নেই। তাই নির্বাচনের আগে নিয়মটির বাস্তবায়ন ঠেকিয়ে দিয়েছেন তিনি।


ওয়াশিংটনের মামলার পাশাপাশি বোস্টনেও একই বিষয় নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ ইন্দিরা তালওয়ানি আগেই ডাক বিভাগকে চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন।


বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের আগের একটি সিদ্ধান্তের কারণে। আগস্টে সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নের একটি পথ খুলে দিয়েছিলেন। তবে আদালত তখন আদেশটির বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। বরং মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর মামলা করার আইনি অধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের পদক্ষেপগুলো বৈধ হবে—এমন নিশ্চয়তাও দেয়নি আদালত। 


এখন ট্রাম্প প্রশাসন আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। প্রশাসন চায়, নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে নতুন ডাকযোগে ভোটের নিয়ম কার্যকরের সুযোগ দেওয়া হোক। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 


ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রশাসনের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটার নির্ধারণের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না; বরং ডাকযোগে নির্বাচনী সামগ্রী পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তুতিমূলক শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। 


অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, নির্বাচন পরিচালনার মূল সাংবিধানিক ক্ষমতা অঙ্গরাজ্য ও কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নির্বাচনের নিয়ম এভাবে বদলাতে পারেন কি না, সেটিই এই আইনি লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। 


ডাক বিভাগের কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নও পরিকল্পনাটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ভোটার কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য কি না তা যাচাই করা ডাককর্মীদের দায়িত্ব নয়। কংগ্রেসে দেওয়া একজন হুইসেলব্লোয়ারের প্রতিবেদনেও সতর্ক করা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর হলে বিপুলসংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। 


ডাকযোগে ভোট নিয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনামুখর। তিনি এই পদ্ধতিতে জালিয়াতির ঝুঁকির কথা বলে আসছেন। তবে ব্যাপক ডাকভোট জালিয়াতির দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট ডাকযোগে দেওয়া হয়েছিল বলে ফেডারেল তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।


এখনই বলা যাচ্ছে না যে ট্রাম্পের ডাকযোগে ভোটের পরিকল্পনা স্থায়ীভাবে বাতিল হয়ে গেছে। বর্তমান অবস্থা হলো—দ্বিতীয় একজন ফেডারেল বিচারক নতুন নিয়মটির বাস্তবায়ন আটকে দিয়েছেন এবং এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই চলছে।


নভেম্বরের নির্বাচনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়ায় আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নয়, ডাকযোগে ভোট দিতে ইচ্ছুক লাখো মার্কিন ভোটারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর