ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বদলাচ্ছে জ্বালানি বাজার, বাড়ছে আমেরিকার গুরুত্ব

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত! মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মাঝেই তেল উৎপাদন ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা দেখছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বদলাচ্ছে জ্বালানি বাজার, বাড়ছে আমেরিকার গুরুত্ব

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় বদলাচ্ছে জ্বালানি বাজার, বাড়ছে আমেরিকার গুরুত্ব


ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সংঘাতের বড় প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম জ্বালানি ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর কাঠামো থেকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরে যেতে পারে। মে মাসে এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে বার্গাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি-ভিত্তিক ভূরাজনীতির কেন্দ্র পশ্চিম গোলার্ধের দিকে চলে গেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, আলাস্কা ও ভেনেজুয়েলার জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।

বার্গামের বক্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তেল ও গ্যাস উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন প্রকল্প, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

বিশেষ করে আলাস্কার উত্তরাঞ্চলে নতুন তেল উৎপাদনের সম্ভাবনাকে মার্কিন প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে। বার্গাম এর আগে জানিয়েছিলেন, আলাস্কার উত্তর ঢালে একটি নতুন প্রকল্প থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের নতুন উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহ শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, কানাডা ও ভেনেজুয়েলার মতো পশ্চিম গোলার্ধের অন্যান্য উৎপাদক দেশও ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বার্গামের দৃষ্টিতে, এই অঞ্চলের বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটবে না। মধ্যপ্রাচ্য এখনো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে কোনো ধরনের বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে দ্রুত প্রভাব পড়ে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বড় তেল উৎপাদক হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের সময়ে দেশটির নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। নতুন তেল ও গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি পাইপলাইন, বন্দর, শোধনাগার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও পরিবহন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি নির্মাণ, পরিবহন, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন বাড়ালেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তেলের বাজার একটি বৈশ্বিক বাজার। বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পড়ে। তাই দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বার্গামের বক্তব্যকে মূলত দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল হিসেবে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সেখানকার তেল পরিবহনে আরও বাধা তৈরি হয়, তাহলে বিকল্প উৎপাদক দেশগুলোর গুরুত্ব বাড়তে পারে। সেই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পশ্চিম গোলার্ধের অন্যান্য উৎপাদক দেশ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেতে পারে।

তবে এখনই বলা যায় না যে বিশ্বের জ্বালানি উৎপাদনের কেন্দ্র পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাচ্ছে। বরং বর্তমান সংঘাত বিশ্বকে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, নতুন উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্ব, তেলের বৈশ্বিক চাহিদা, নতুন উৎপাদন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ একদিকে তেলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোর জন্য জ্বালানি উৎপাদন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি করছে। ডগ বার্গামের বক্তব্য মূলত এই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে—ভবিষ্যতের বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতিতে পশ্চিম গোলার্ধ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর