পবিত্র আল-আকসায় ইসরায়েলিদের অনুপ্রবেশ: চলছে পূর্ব জেরুজালেমের উত্তাপ

পূর্ব জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা প্রাঙ্গণে কড়া পুলিশি পাহারায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

পবিত্র আল-আকসায় ইসরায়েলিদের অনুপ্রবেশ: চলছে পূর্ব জেরুজালেমের উত্তাপ
পবিত্র আল-আকসায় ইসরায়েলিদের অনুপ্রবেশ: চলছে পূর্ব জেরুজালেমের উত্তাপ

পূর্ব জেরুজালেমের ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উসকানিমূলক অনুপ্রবেশ ঘিরে নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইহুদি নববর্ষের শেষ দিনে ইসরায়েলি পুলিশের সুদৃঢ় নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে প্রায় ২৪০ জন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা ইসরায়েলের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং বিভিন্ন তালমুদিক আচার-অনুষ্ঠান ও প্রার্থনা সম্পন্ন করেন। ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কড়া পুলিশি পাহারায় ইহুদি ধর্মানুসারীরা এই বিতর্কিত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে যা আল-আকসার ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার এক সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা।  


এই ঘটনার সময় জেরুজালেমের পুরনো শহর ও আল-আকসার চারপাশের প্রবেশপথগুলোতে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর সামরিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফিলিস্তিনি মুসলিম নিখাদ উপাসকদের প্রবেশে নানামুখী বাধা তৈরি করা হয়। অনেক ফিলিস্তিনির পরিচয়পত্র বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং বয়স্ক ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্য ফিলিস্তিনিদের মসজিদে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এর ফলে আল-আকসার পবিত্র চত্বরে উপাসনা করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন ফিলিস্তিনিরা, অন্যদিকে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নির্বিঘ্নে আচার পালনের বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়।  


ঘটনাটি বিশ্লেষণ ও যাচাই করে দেখা গেছে যে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের এই অনুপ্রবেশ একটি নিয়মিত কিন্তু সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ, যা মূলত বিভিন্ন ইহুদি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে তীব্র আকার ধারণ করে। আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ যা মুসলিমদের কাছে "আল-হারাম আল-শরিফ" নামে পরিচিত, তা ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। অন্যদিকে, ইহুদিরা এই স্থানটিকে "টেম্পল মাউন্ট" নামে অভিহিত করে এবং দাবি করে যে প্রাচীনকালে এখানে তাদের দুটি ঐতিহাসিক মন্দির ছিল।
ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক "স্ট্যাটাস কো" বা স্থিতাবস্থা চুক্তি অনুযায়ী, আল-আকসা প্রাঙ্গণে কেবল মুসলিমরাই উপাসনা ও প্রার্থনা করার অধিকার রাখেন। অমুসলিম দর্শনার্থীরা সেখানে কেবল নির্দিষ্ট সময়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতে পারেন, কিন্তু কোনো প্রকার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা প্রার্থনা পরিচালনা করতে পারেন না। তবে দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ উঠছে যে, ইসরায়েলি চরমপন্থী দলগুলো এবং ইসরায়েলি সরকার এই দীর্ঘদিনের চুক্তি ও ঐতিহাসিক প্রথা লঙ্ঘন করছে।  


 সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি চরমপন্থী সংগঠনগুলো তাদের অনুসারীদের আল-আকসায় সংগঠিতভাবে প্রবেশ করার এবং সেখানে শিন শিঙা বা "সোফার" বাজানোসহ বিভিন্ন তালমুদিক আচার পালনের উসকানি দিচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতিতে পতাকা উত্তোলন ও উসকানিমূলক নৃত্য ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় অনুভূতিকে গভীরভাবে আঘাত করেছে এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।  


সামরিক কঠোরতা ও ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ
আল-আকসায় প্রবেশের পশ্চিম দিকের মরক্কো গেট বা 'বাব আল-মাগারিবা' ব্যবহার করে বসতি স্থাপনকারীরা দলবেঁধে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা মসজিদের উঠানে উসকানিমূলকভাবে ঘুরে বেড়ান। একই সময়ে পুরনো শহরের গলিগুলোতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অতিরিক্ত চৌকি স্থাপন করে ফিলিস্তিনিদের যাতায়াত পুরো অবরুদ্ধ করে ফেলে। ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, উৎসবের অজুহাতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন চলাচলের ওপর ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে অচল করে দিয়েছে।  


ইসলামিক ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ওয়াকফ কর্মকর্তাদের মতে, জোরপূর্বক আল-আকসার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক চরিত্র পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পূর্ব জেরুজালেমকে ইহুদিকরণ বা জুডাইজেশনের অংশ হিসেবে ইসরায়েল এই ধরনের চরমপন্থী কর্মকাণ্ডে সরাসরি নিরাপত্তা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ফিলিস্তিনি নেতৃবৃন্দ।  


চলমান উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং পরবর্তীতে তা নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা জাতিসংঘ কখনও স্বীকৃতি দেয়নি। বিশ্ব রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের এই ভূখণ্ডগত ও ধর্মীয় দ্বন্দ্ব সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও আরব দেশগুলো বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে যে, আল-আকসা মসজিদে এই ধরনের কোনো উসকানি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।  


ফিলিস্তিন সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেরুজালেম বিষয়ক বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, আল-আকসায় ইসরায়েলি উগ্রপন্থীদের এই বেআইনি অনুপ্রবেশ ও ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক নিষেধাজ্ঞা কেবল ওই নির্দিষ্ট প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকাসহ পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন যাতে তারা পবিত্র স্থানের ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান অন্যায় বিধিনিষেধ বন্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।  


প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…