সৎ মায়ের অত্যাচারে ঘর ছেড়ে পা হারানো কিশোর রায়হান উদ্ধার চুনতি সীরাত মাহফিলে

সৎ মায়ের অত্যাচারে ঘর ছেড়ে ভিক্ষুক চক্রের শিকার হয়ে পা হারানো রায়হান সাত মাস পর স্বজনদের কাছে ফিরে এসেছে।

সৎ মায়ের অত্যাচারে ঘর ছেড়ে পা হারানো কিশোর রায়হান উদ্ধার চুনতি সীরাত মাহফিলে

সৎ মায়ের অত্যাচারে ঘর ছেড়ে পা হারানো কিশোর রায়হান উদ্ধার চুনতি সীরাত মাহফিলে


সাত মাস আগে চুল কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছরের কিশোর রায়হান উদ্দিন অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। রোববার রাতে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নে ঐতিহাসিক ১৯ দিনব্যাপী চুনতি সীরাত মাহফিলের সমাপনী দিনে তাকে খুঁজে পান তার বাবা নাজিম উদ্দিন। সীরাত ময়দানে তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখে তার এক প্রতিবেশী রায়হানের বাবাকে বিষয়টি জানান। পরে স্বজনরা দ্রুত সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। তবে দীর্ঘ সাত মাস পর ফিরে আসা রায়হানকে দেখে আনন্দে ভেসে যাওয়ার বদলে স্বজনদের বুকে হাহাকার উঠে এসেছে। কারণ, সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ছাড়লেও রায়হান ফিরে এসেছে পঙ্গু হয়ে, তার ডান পা কাটা অবস্থায়।


পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রায়হানের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নয়াপাড়া এলাকায়। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৎ মায়ের নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সাত মাস আগে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় সে। চুল কাটার অজুহাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা বাস স্টেশনে চলে যায়। সেখান থেকে বাসে চড়ে পৌঁছায় পর্যটন শহর কক্সবাজারে। কক্সবাজারে কয়েকদিন একা ঘোরাঘুরির পর একটি অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়ে এই অবোধ শিশু। চক্রের সদস্যরা তাকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে এবং কাজের কথা বলে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে যায়।


ঢাকায় আনার পরই শিশুটির জীবনে নেমে আসে নারকীয় যন্ত্রণা। রায়হানের দাবি, ঢাকায় নেওয়ার পর অপরাধী চক্রটির সদস্যরা তাকে আটকে রাখে এবং পরবর্তীতে ভিক্ষাবৃত্তিতে মানুষের করুণা আদায় সহজ করতে তার ডান পা কেটে দেয়। জখম ও অঙ্গহানির যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মধ্যেই তাকে নামিয়ে দেওয়া হয় রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জখম হওয়া পা নিয়ে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশের এলাকায় তাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হতো। চক্রের সদস্যরা সবসময় তার ওপর নজরদারি করত। রায়হান জানায়, প্রতিদিন ভিক্ষা করে অন্তত ৫০০ টাকা তাকে ওই চক্রের সদস্যদের হাতে তুলে দিতে হতো। নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তুলতে না পারলে তার ওপর চালানো হতো শারীরিক নির্যাতন ও অমানুষিক আচরণ। ওই ভিক্ষুক চক্রে তার মতো আরও বেশ কয়েকজন শিশু বন্দি রয়েছে বলেও সে জানায়। তবে কৌশলে একদিন সুযোগ বুঝে সেই চক্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে ট্রেনে ও বাসে চেপে চুনতি সীরাত মাহফিলে চলে আসে সে। সেখানেই ভাগ্যেক্রমে নিজ বাবার সঙ্গে তার দেখা হয়।


রায়হানের বাড়ি ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার শত শত মানুষ এক নজর দেখার জন্য তাদের বাড়িতে ভিড় জমায়। সুস্থ-সবল একটি কিশোরের এমন করুণ পরিণতি দেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয়রা রায়হানের ওপর অত্যাচারকারী সৎ মায়ের ভূমিকা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ঢাকায় যে পাচারকারী ও ভিক্ষা বাণিজ্য চক্র তার পা কেটে দিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।


রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন ছেলেকে ফেরত পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ছেলেকে হারিয়ে তারা দীর্ঘ সাত মাস ধরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেছেন। কিন্তু তার অবাধ্য ছেলে যে এমন নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে বিকলাঙ্গ অবস্থায় ফিরে আসবে, তা তারা ভাবতেও পারেননি। নাজিম উদ্দিন বলেন, আমার নিষ্পাপ ছেলের জীবন যারা এভাবে পঙ্গু করে দিল, আমি সেই অপরাধী চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। বর্তমানে রায়হানের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করাই পরিবারের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।


ঘটনাটি লোহাগাড়া থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, পুরো বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কিশোর রায়হানের জবানবন্দি অনুযায়ী অপরাধী চক্রটির সন্ধান পেতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর