বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কে কে পরিচালনা করে? সাইমা ওয়াজেদের অমীমাংসিত মামলা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে—সাইমা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে আসলে কী অভিযোগ রয়েছে, এবং কেন তাকে সেই অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কে কে পরিচালনা করে? সাইমা ওয়াজেদের অমীমাংসিত মামলা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে—সাইমা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে আসলে কী অভিযোগ রয়েছে, এবং কেন তাকে সেই অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি?
সাইমা ওয়াজেদ নিজে থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের (SEARO) আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ে বসেননি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি নির্বাচিত হন। ওই অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া ১০টি ভোটের মধ্যে তিনি ৮টি ভোট পান। পরবর্তী সময়ে WHO-এর নির্বাহী বোর্ড সংস্থার সংবিধানের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে তার নির্বাচন অনুমোদন করে। তিনি ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। এই কর্তৃত্ব WHO মহাপরিচালকের কাছ থেকে আসেনি; বরং WHO-এর স্বীকৃত বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই অঞ্চলের সরকারগুলোর কাছ থেকেই তার ম্যান্ডেট এসেছে।
২০২৫ সালের ১১ জুলাই WHO তাকে ছুটিতে পাঠায় বলে দ্য ডেইলি স্টার ও আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে পাঠানো দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৪ মাসেরও বেশি সময় পরও তিনি ছুটিতেই রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের কোনো ফলাফলও প্রকাশ করা হয়নি। হেলথ পলিসি ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, WHO গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
অর্থাৎ, কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া একজন নারী এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই কার্যালয় থেকে কার্যত দূরে রয়েছেন, যে পদে তাকে ওই অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলো নির্বাচিত করেছিল। অভিযোগের বিষয়ে তাকে স্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না, নিজের বক্তব্য রাখার যথাযথ সুযোগ তিনি পেয়েছেন কি না, কিংবা তার বিরুদ্ধে চলমান প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে তাকে নিয়মিতভাবে অবহিত করা হয়েছে কি না—এসব নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
এখানেই মূল বিষয়টি নিহিত। ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া বা ডিউ প্রসেস কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, যা অভিযোগটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলে কোনো প্রতিষ্ঠান উপেক্ষা করতে পারে। এটি এমন একটি মৌলিক মানদণ্ড, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর যার কর্তৃত্ব নিয়োগের পরিবর্তে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত, তার ক্ষেত্রে এই নীতির গুরুত্ব আরও বেশি। কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তার পদকে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে অর্থহীন করে দেওয়া উচিত নয়, যার কোনো আনুষ্ঠানিক পরিণতি নেই।
এ ক্ষেত্রে WHO মহাপরিচালকের কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাপরিচালকের দপ্তর সরাসরি বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে—যে সংস্থার অভিযোগের ভিত্তিতেই ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। অথচ একই ধরনের স্বচ্ছতা ওয়াজেদকে তার নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দেওয়া হয়নি।
কোনো নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালকের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের উচিত নিরপেক্ষ থাকা এবং যে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে অভিযোগটির সূত্রপাত হয়েছে, তার প্রভাব থেকে নিজেকে দূরে রাখা। একটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর দেশীয় সংস্থার উত্থাপিত, এখনও অপ্রমাণিত অভিযোগকে কার্যত প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা, অথচ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার কাছেই প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখা—এটি নিরপেক্ষতার পরিচয় নয়। বরং এর বিপরীত বলেই মনে হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি খোঁজার খবর। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, WHO মহাপরিচালক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে মনোনয়ন চাওয়া শুরু করেছেন—যেন পদটি শূন্য হয়ে গেছে। কিন্তু পদটি এখনো শূন্য হয়নি। ওয়াজেদ পদত্যাগ করেননি, তাকে বরখাস্তও করা হয়নি এবং কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্তও করা হয়নি।
ছুটি মানে পদচ্যুতি নয়। মহাপরিচালক যদি মনে করেন পদটি শূন্য ঘোষণা করা উচিত, তাহলে সৎ ও স্বচ্ছ পথ হলো আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানানো এবং যে আঞ্চলিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওয়াজেদ নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। অথচ তিনি যখন বেতনহীন ছুটিতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি, তখন নীরবে একজন উত্তরসূরি খোঁজার উদ্যোগকে WHO-এর নিয়মের বাইরে একটি পদ শূন্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাপ্রবাহকে কেবল স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন। ১৪ মাসের নীরবতা, নতুন কোনো তদন্ত-ফলাফল উল্লেখ না করেই বেতনসহ ছুটি থেকে বেতনহীন ছুটিতে স্থানান্তর, অভিযোগের উৎস দেশীয় সংস্থার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি একই ধরনের স্বচ্ছতার অনুপস্থিতি এবং এমন একটি পদে উত্তরসূরি খোঁজার উদ্যোগ, যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য হয়নি—সবকিছুই প্রশ্ন তৈরি করছে।
ওয়াজেদের বিরুদ্ধে যদি সত্যিই প্রমাণিত কোনো শক্তিশালী মামলা থাকে, তাহলে এত দীর্ঘ সময় ধরে এসব পদক্ষেপের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। WHO প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারত, নিজস্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারত এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পরও তা করা হয়নি। এই পরিস্থিতি নিজেই কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এতে এমন একটি চিত্র তৈরি হয় যে, একটি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে—এমন একজন আঞ্চলিক নেতার বিরুদ্ধে, যার ম্যান্ডেট WHO মহাপরিচালকের কাছ থেকে নয় এবং যাকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগই মিথ্যা বা তিনি সব অভিযোগ থেকে নির্দোষ। সেটি এই লেখার বক্তব্য নয়। কারণ বিষয়টির বাইরে থাকা কেউই তার দোষ বা নির্দোষতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। কারণ WHO নিজেই সেই প্রক্রিয়াকে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে দেয়নি, যেখানে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব।
যা বলা যায় তা হলো—একজন নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে ওয়াজেদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে তা জানার অধিকার তার রয়েছে; অভিযোগের প্রমাণ দেখার অধিকার রয়েছে; নিজের বক্তব্য ও জবাব দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে; এবং একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু তিনি এসবের কোনোটিই পাননি—এমন অভিযোগই এখন সামনে রয়েছে। বরং তাকে বেতনহীন অবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা হয়েছে, আর যে কার্যালয় পরিচালনার জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেটি তার অনুপস্থিতিতেই কার্যত পরিচালিত হচ্ছে।
WHO নিয়মিতভাবে বিশ্বের সরকারগুলোকে বলে থাকে যে সরকারি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার অধীন হতে হবে। এখন সময় এসেছে সংস্থাটি একই মানদণ্ড নিজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার।
সাইমা ওয়াজেদের প্রয়োজন এমন কিছু, যা অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো ব্যক্তির প্রাপ্য—একটি ন্যায্য শুনানি, একটি স্পষ্ট সময়সীমা এবং একটি প্রকৃত সিদ্ধান্ত। অনির্দিষ্টকালের নীরবতা নয়, যা শেষ পর্যন্ত নিজেই এক ধরনের রায়ের মতো কার্যকর হয়ে ওঠে।