শ্রমিকদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের দাবিতে নিউইয়র্কে জোহারান মামদানি

শ্রমিক দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কের শ্রমিক আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে কর্মজীবী মানুষের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহারান মামদানি।

শ্রমিকদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের দাবিতে নিউইয়র্কে জোহারান মামদানি

শ্রমিকদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের দাবিতে নিউইয়র্কে জোহারান মামদানি


শ্রমিক দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে জোহারান মামদানি বলেন, নিউইয়র্ক শহর শুধু ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য নয়; যারা প্রতিদিন পরিশ্রম করে শহরটিকে সচল রাখেন, এই শহর তাদেরও।

মামদানি বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিউইয়র্কের শ্রমিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে কর্মজীবী মানুষের জন্য ন্যায্য আচরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করে এসেছে। তার প্রশাসন সেই ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিতে চায়।

নগর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির ভোক্তা ও শ্রমিক সুরক্ষা দপ্তরের মাধ্যমে মামদানি প্রশাসন শ্রমিকদের জন্য এক কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে।

জুলাইয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওয়ালগ্রিনস, অলস্টার নিরাপত্তা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান, ক্যালজেডোনিয়া এবং কিনশিপ কফির বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এক হাজার ছয়শোর বেশি শ্রমিকের জন্য মোট প্রায় ২১ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে মামদানি প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমিকদের জন্য আদায় করা মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় এক কোটি ১০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

শ্রমিকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আরও বড় পদক্ষেপ হিসেবে ৭ সেপ্টেম্বর মেয়র মামদানি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মেয়রের শ্রমিক ক্ষমতায়ন দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের দপ্তর এটিই প্রথম।

নতুন এই দপ্তরের প্রধান লক্ষ্য হলো শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের সংগঠিত হতে সহায়তা করা এবং শ্রম অধিকার নিয়ে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা।

নতুন দপ্তরের প্রথম নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রমিক সংগঠক টনি পার্লস্টেইনকে। তিনি এর আগে নৌবন্দর শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শ্রমিক সংগঠনের সংগঠন গড়ার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মামদানি প্রশাসনের ভাষ্য, যেসব শ্রমিক পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, উপযুক্ত মজুরি কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করাই নতুন দপ্তরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

মামদানি তার বক্তব্যে নিউইয়র্কের শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলেই আট ঘণ্টার কর্মদিবস, সপ্তাহান্তের ছুটি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার মজুরি, ন্যূনতম মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নিউইয়র্কের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও এবারের কর্মসূচির বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে। নিউইয়র্ক নগর কেন্দ্রীয় শ্রম পরিষদের আয়োজিত এবারের শ্রমিক দিবসের সমাবেশ ও পদযাত্রার মূল বার্তা ছিল আমাদের শহর, আমাদের লড়াই, আমাদের ভবিষ্যৎ।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের শ্রমিকরাই নির্মাণ, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের মাধ্যমে প্রতিদিন শহরকে সচল রাখেন। তাদের শ্রমের ওপরই শহরের অর্থনীতি ও নাগরিক জীবন অনেকাংশে নির্ভরশীল।

তবে মামদানির শ্রমিকবান্ধব নীতির সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শ্রমিক সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলে কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে মামদানি প্রশাসনের বক্তব্য হলো, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর লড়াই তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। কর্মজীবী মানুষের আয়, কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা উন্নত না হলে নিউইয়র্কের সামগ্রিক উন্নয়নও অর্থবহ হবে না বলে মনে করে তার প্রশাসন।

বিশেষ করে অভিবাসী ও নিম্নআয়ের শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক শ্রমিক নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানায় মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ কিংবা অন্যান্য বৈষম্যের শিকার হতে পারেন। নতুন দপ্তর এসব বিষয়ে শ্রমিকদের তথ্য ও সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেবার ডে উপলক্ষে মামদানি বলেন, কর্মজীবী মানুষ যেন নিউইয়র্কে শুধু কাজ করার সুযোগই না পান, বরং সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারেন, পরিবার গড়তে পারেন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারেন তার প্রশাসন সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।

মামদানির এই উদ্যোগ নিউইয়র্কের শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন অভিবাসী ও কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব প্রবাসী দীর্ঘ সময় কাজ করেও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অধিকার নিয়ে সমস্যায় পড়েন, তাদের জন্য শ্রমিক অধিকার সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শ্রমিক দিবসের এই কর্মসূচির মাধ্যমে মামদানি আবারও তার প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার স্পষ্ট করেছেন নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যেন শুধু বড় ব্যবসা ও উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শহরকে প্রতিদিন সচল রাখা সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জীবনেও তার সুফল পৌঁছায়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর