নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি, চাপে দৈনন্দিন জীবন—বাড়ছে জনমনে অসন্তোষ

মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে স্বস্তি ফিরছে না। চাল, ভোজ্যতেল, ডাল, ডিম, মুরগি, পেঁয়াজ ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বাড়ছে চাপ, কমছে সঞ্চয় ও অন্যান্য খাতে ব্যয়

নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি, চাপে দৈনন্দিন জীবন—বাড়ছে জনমনে অসন্তোষ

নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি, চাপে দৈনন্দিন জীবন—বাড়ছে জনমনে অসন্তোষ


মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে স্বস্তি ফিরছে না। চাল, ভোজ্যতেল, ডাল, ডিম, মুরগি, পেঁয়াজ ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বাড়ছে চাপ, কমছে সঞ্চয় ও অন্যান্য খাতে ব্যয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, জুলাই ২০২৬-এ দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ, যা জুনের ৯.১৬ শতাংশের তুলনায় কম। তবে এক বছর আগের জুলাইয়ের ৮.৫৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকায় পণ্যের দাম কমে যাওয়ার পরিবর্তে মূলত দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। 

চালের বাজারে স্থায়ী চাপ

নিত্যদিনের প্রধান খাদ্য চালের দামেও স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। জুলাইয়ের শুরুতে ঢাকার বাজারে নাজির/মিনিকেট চাল ৭২–৮৫ টাকা, মাঝারি মানের পাইজাম/আটাশ ৫৫–৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫০–৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। 

এর আগে জুন ২০২৬-এ বাজারে চালের দাম এক ধাক্কায় কেজিতে প্রায় ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ নতুন ধান ওঠার পরও বাজারে চালের দামে প্রত্যাশিত স্বস্তি সবসময় দেখা যাচ্ছে না। 

তেল-মুরগি-ডিমেও বাড়তি খরচ

২০২৬ সালের শুরুতেই ঢাকার বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে প্রায় ১৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯০ থেকে বেড়ে প্রায় ২০০ টাকা হয়েছিল। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৫৫–১৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০–১৮০ টাকা কেজি হয়। 

তবে বাজারে সব পণ্যের দাম একই সময়ে বাড়েনি। জুলাইয়ের শুরুতে টিসিবির বাজার পর্যবেক্ষণে খোলা সয়াবিন তেল ১৮৬–১৯২ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৬০–১৮০ টাকা, স্থানীয় পেঁয়াজ ৩৫–৪৫ টাকা কেজি দরে পাওয়া যায়। একই সময়ে ছোট দানা ডাল ছিল ১৫০–১৬০ টাকা, বড় দানা ডাল ৯০–১০৫ টাকা, চিনি ১০৫–১১০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৮০–৮৫০ টাকা কেজি। 

খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগ

মে ২০২৬-এ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.০৬ শতাংশে উঠেছিল, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ৯.৪২ শতাংশে নিয়ে যায়। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬০ শতাংশ এবং জুলাইয়ে আরও কমে প্রায় ৭.১৬ শতাংশ হয়। 

কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারদর কমে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো—পণ্যের দাম আগের তুলনায় ধীর গতিতে বাড়ছে। ফলে কয়েক বছর ধরে উচ্চমূল্যে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ভোক্তারা বাজারে প্রকৃত স্বস্তি পাচ্ছেন না।

আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ায় ক্ষোভ

মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। চাল-ডাল-তেল থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ডিম ও সবজির বাজার সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন কিংবা সঞ্চয়ের মতো খাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে।

বিশেষ করে বাজারে দাম কমার পরিবর্তে শুধু মূল্যবৃদ্ধির হার কমে আসায় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের সঙ্গে সবসময় মিলছে না। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও মূল্যস্ফীতি কমলেও মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বেশি থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।

কেন কমছে না দাম?

অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর এবং বাজারে সরবরাহের ওঠানামা—সব মিলিয়েই নিত্যপণ্যের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সরকারি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেও সাপ্লাই-চেইনের দুর্বলতা, আমদানি করা জ্বালানির ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাকে মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) হিসাবে, আগস্ট ২০২৬-এ বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচক ১.৯ শতাংশ বেড়ে ১৩৩.৩ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের শেষের পর সর্বোচ্চ। শস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধপণ্যের দামই এ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। 

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাজার ব্যবস্থাপনা

সরকার ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। 

তবে শুধু কর কমানো বা নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করলেই বাজারে স্থায়ী স্বস্তি আসবে না। উৎপাদক থেকে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট বন্ধ এবং বাজারে নিয়মিত কার্যকর অভিযান জরুরি।

মূল কথা হলো—মূল্যস্ফীতি কমলেও নিত্যপণ্যের দাম এখনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় বেশি। তাই সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কমার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বাজার-অভিজ্ঞতাতেও যদি স্বস্তি না ফেরে, তাহলে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ আরও বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। 

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর