গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরানোর প্রস্তাবে ইসরায়েলে নতুন বিতর্ক, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব আবার সামনে আসায় ইসরায়েলি রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়েছে।
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরানোর প্রস্তাবে ইসরায়েলে নতুন বিতর্ক, বাড়ছে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে
গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার বিতর্কিত ধারণা আবারও ইসরায়েলের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ইসরায়েলি সরকারের ডানপন্থী জোটের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা গাজার বাসিন্দাদের তথাকথিত “স্বেচ্ছায় অভিবাসন” নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্যের পর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
রয়টার্সের ৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গাজার জনসংখ্যাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সাত বছরের একটি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি ভবিষ্যৎ ইসরায়েলি সরকারের অধীনে এই ধরনের অভিবাসন তদারকির জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের কথাও বলেছেন। তার দলের পক্ষ থেকে তুরস্ক, ইথিওপিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মতো কয়েকটি দেশের নাম সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও এর আগে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গাজার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হলে অভিবাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, পরিস্থিতি তৈরি হলে সমুদ্র, আকাশ বা অন্যান্য পথে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবশ্য জোর করে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছেন। তারা বিষয়টিকে “স্বেচ্ছায় অভিবাসন” হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি নেতারা এবং বহু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এই বক্তব্য নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
ফিলিস্তিনিদের আশঙ্কার মূল কারণ ইতিহাস। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা “নাকবা” বা বিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করেন। ফলে গাজার বাসিন্দাদের অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো পরিকল্পনা তাদের মধ্যে নতুন করে একই ধরনের বাস্তুচ্যুতির ভয় তৈরি করছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ফলে গাজা যুদ্ধ এবং এর ভবিষ্যৎ এখন ইসরায়েলি রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
ডানপন্থী রাজনীতিকদের বক্তব্যের পেছনে নির্বাচনী রাজনীতির বিষয়টিও রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। তাদের মতে, সরকারের ডানপন্থী অংশ যুদ্ধের কঠোর অবস্থানকে সমর্থকদের সামনে তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধের পর গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক সমাধান চায়।
গাজা বর্তমানে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সংঘাতের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজেদের বাড়িঘর হারিয়েছেন। অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাসপাতাল, বিদ্যালয়, পানি সরবরাহ এবং খাদ্যব্যবস্থার ওপরও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে।
ইসরায়েল বলছে, তাদের সামরিক অভিযান হামাসের বিরুদ্ধে পরিচালিত এবং তাদের লক্ষ্য বেসামরিক জনগণ নয়। ইসরায়েল গণহত্যার অভিযোগও অস্বীকার করে। অন্যদিকে জাতিসংঘের একটি তদন্তে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এই বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, গাজার ভবিষ্যৎ কী হবে। যুদ্ধ বন্ধ হলে গাজা পুনর্গঠন কে করবে, সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, ফিলিস্তিনি প্রশাসনের ভূমিকা কী হবে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের এখনো পূর্ণাঙ্গ উত্তর নেই।
ফিলিস্তিনিরা বলছেন, গাজা তাদের ভূমি এবং তারা সেখানে থাকতে চান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে গাজায় বাস্তুচ্যুত এক বাসিন্দার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, তারা তাদের ভূমিতে জন্মেছেন এবং তাদের সন্তানরাও সেখানে বেড়ে উঠেছে। তাই গাজা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার ধারণা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
আরব দেশগুলোও দীর্ঘদিন ধরে গাজার জনসংখ্যাকে অন্য দেশে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও দুর্বল হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার ফিলিস্তিনিদের অন্যত্র স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের একটি ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। পরে ওই পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক বিরোধিতা তৈরি হয়। আরব দেশগুলো এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ইসরায়েলের বর্তমান ডানপন্থী রাজনীতিকরা আবারও একই ধরনের ধারণা সামনে আনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিকল্পনা আসলে কোন দিকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডানপন্থী জোটের সব পরিকল্পনার সঙ্গে একমত নন। তিনি তথাকথিত স্বেচ্ছায় অভিবাসনের ধারণাকে সমর্থন করলেও গাজায় নতুন ইহুদি বসতি স্থাপনের কিছু পরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে জোটের ভেতরে ডানপন্থী শক্তির প্রভাব যথেষ্ট। ফলে নির্বাচনের আগে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গাজায় স্থায়ী শান্তির জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় থাকবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় রাখতে হবে।
গাজা থেকে জনগণকে সরিয়ে দেওয়ার যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু স্থানীয় সমস্যা থাকবে না; মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, শরণার্থী সংকট এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্থানীয় জনগণের মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের পর গাজা পুনর্গঠন করতে হলে ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বর্তমানে গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি অত্যন্ত জটিল। একদিকে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে কঠোর অবস্থান—দুই বিপরীত প্রবণতা একই সময়ে চলছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়ার বক্তব্য তত বেশি রাজনৈতিক আলোচনায় আসছে। তবে এই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা সম্ভব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।