ইরানের হামলায় কুয়েতসহ উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোতে নতুন করে বাড়ছে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ভয় আশঙ্কা

ইরানের পাল্টা হামলায় কুয়েত ও বাহরাইনসহ মার্কিন মিত্ররা সতর্ক, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে নতুন করে।

ইরানের হামলায় কুয়েতসহ উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোতে নতুন করে বাড়ছে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ভয় আশঙ্কা

ইরানের হামলায় কুয়েতসহ উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোতে নতুন করে বাড়ছে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ভয় আশঙ্কা


মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর এর প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কুয়েত, বাহরাইন ও অন্যান্য মার্কিন মিত্রদেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জানিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, কুয়েত ও বাহরাইন হামলার শিকার হওয়ার কথা নিশ্চিত করলেও ওই সময় বড় ধরনের বেসামরিক হতাহতের খবর জানায়নি। 

ঘটনার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে সামরিক হামলা। মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর পরপরই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং সহযোগী দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনার দিকে হামলা চালাতে শুরু করে। 

কুয়েতের জন্য পরিস্থিতিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কুয়েত দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সরাসরি কুয়েতের আকাশসীমা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে।

বাহরাইনও একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে। দেশটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক উপস্থিতি রয়েছে। ফলে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে বাহরাইন স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, বাহরাইন ইরানের আকাশ হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। 

জর্ডানও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাতটি শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সামরিক প্রভাব ক্রমেই বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। 

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হিসেবে এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল কমে গেলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কয়েক দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ দশমিক ৭৮ ডলারে উঠেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৯১ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছেছিল। এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। মূল কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ভয়। 

এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু তেল ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ে না। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বিমান পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, জাহাজ এবং শিল্পকারখানার খরচও বাড়তে পারে। এর ফলে খাদ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন পণ্যের দাম পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে রাখতে হতে পারে।

ইরানও দেখাতে চাইছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা তার রয়েছে। তবে হামলার উদ্দেশ্য, লক্ষ্যবস্তু এবং ভবিষ্যৎ মাত্রা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও বা ছবি দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা নিরাপদ নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত কুয়েত বা বাহরাইনের ওপর হামলা মানেই ওই দেশগুলো যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক পক্ষ হয়ে গেছে, এমনটা বলা ঠিক হবে না। তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেও নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা প্রতিহত করার অবস্থানেই রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে তাই ঘটনাগুলোকে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে, নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধজোট হিসেবে নয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর