ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে মজুত ভরবে আমেরিকা, ট্রাম্পের জরুরি তেলভান্ডার পুনর্গঠনে নতুন পরিকল্পনা

ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল সরাসরি মজুতে না রেখে যুক্তরাষ্ট্রের হালকা তেলের সঙ্গে বদলের পরিকল্পনা জানালেন জ্বালানি সচিব বাজারের চাপে।

ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে মজুত ভরবে আমেরিকা, ট্রাম্পের জরুরি তেলভান্ডার পুনর্গঠনে নতুন পরিকল্পনা

ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে মজুত ভরবে আমেরিকা, ট্রাম্পের জরুরি তেলভান্ডার পুনর্গঠনে নতুন পরিকল্পনা


যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জরুরি তেলভান্ডার বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ পুনরায় পূরণ করতে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া তেল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি মজুত বাড়ানো হবে। কিন্তু সমস্যা হলো—ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী এবং বেশি সালফারযুক্ত হওয়ায় সেটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি মজুতে রাখা সহজ নয়।

এই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট একটি তেল বিনিময় ব্যবস্থার কথা বলেছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারে যেতে পারে এবং তার বিনিময়ে সমপরিমাণ হালকা বা মাঝারি মানের মার্কিন তেল কৌশলগত জরুরি মজুতে ঢোকানো যেতে পারে। এতে ভেনেজুয়েলার তেলও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হবে, আবার জরুরি মজুতের জন্য প্রয়োজনীয় উপযুক্ত ধরনের অপরিশোধিত তেলও পাওয়া যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভান্ডার বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেল মজুত ব্যবস্থাগুলোর একটি। সাধারণ সময়ে এটি বাণিজ্যিক বাজারের জন্য নয়; বরং বড় ধরনের সরবরাহ সংকট, যুদ্ধ বা জ্বালানি বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতার সময় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এই মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার ফলে এর মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।


রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভান্ডারে প্রায় ২৯ কোটি ব্যারেল তেল ছিল, যা কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়। এর ফলে নতুন করে আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট দেখা দিলে আগের মতো দ্রুত বাজারে অতিরিক্ত তেল ছাড়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন মজুত পুনর্গঠনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।


বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের বাজারও অস্থির। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল ছয় সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।


এমন পরিস্থিতিতে জরুরি তেলভান্ডার শক্তিশালী করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহার করে দ্রুত মজুত পূরণ করা যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নত করা, পরিবহন ব্যবস্থা প্রস্তুত করা এবং শোধনাগারের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা—সবকিছুতেই সময় প্রয়োজন।


ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্যই মূল সমস্যা। ভারী তেলে সালফারের পরিমাণ বেশি এবং এর ঘনত্বও বেশি। কৌশলগত জরুরি মজুতের গুহাগুলোতে সাধারণত অপেক্ষাকৃত হালকা এবং কম সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল রাখা হয়। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল সরাসরি সেখানে ঢোকানোর পরিবর্তে বিনিময় বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে।


এই কারণেই রাইটের বিনিময় প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ভারী তেল নিজের শোধনাগারে ব্যবহার করতে পারে, যেখানে সেই ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। বিনিময়ে হালকা বা মাঝারি তেল কৌশলগত মজুতে পাঠানো যেতে পারে। এ ধরনের বিনিময় ব্যবস্থা অতীতেও তেল মজুত ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই পরিকল্পনার সঙ্গে জ্বালানি বাজারের রাজনৈতিক দিকও জড়িত। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল খাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে চাইছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে চায়, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি করার সম্ভাবনাও দেখছে।


ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির অর্থনীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশটির উৎপাদন ক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হলে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বড় বিনিয়োগ আসতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো ভেনেজুয়েলায় নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।


এর মধ্যে শেভরন ভেনেজুয়েলায় আগামী পাঁচ বছরে সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য উৎপাদন প্রায় ছয় লাখ ব্যারেল প্রতিদিনের পর্যায়ে নেওয়া। এতে বোঝা যায়, ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।


তবে সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই পরিকল্পনায় গ্যাসের দাম কি দ্রুত কমবে? বাস্তবে তার উত্তর এখনই হ্যাঁ বলা যাচ্ছে না। তেলক্ষেত্র উন্নয়ন, উৎপাদন বাড়ানো এবং পরিবহন অবকাঠামো প্রস্তুত করতে সময় লাগে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেল চুক্তি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পে বড় ধরনের মূল্যহ্রাস এনে দেবে—এমন প্রত্যাশার ভিত্তি নেই।


বরং পরিকল্পনাটির বড় উদ্দেশ্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা। জরুরি তেলভান্ডার শক্তিশালী থাকলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র বাজারে দ্রুত তেল ছাড়তে পারে। এতে সরবরাহের চাপ সাময়িকভাবে কমানো এবং জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখার সুযোগ বাড়ে।

তবে মজুতের বর্তমান অবস্থাও উদ্বেগের। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুত ২৫ কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি বা তার নিচে নেমে গেলে শুধু পরিমাণ নয়, অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জরুরি মজুত পুনর্গঠন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।


ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তেল চুক্তি তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক তেল বাজার, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের জ্বালানি নীতি—সবকিছু একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।


বর্তমানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হচ্ছে ভেনেজুয়েলার ভারী তেল সরাসরি জরুরি মজুতে ঢোকানোর পরিবর্তে তা মার্কিন শোধনাগারে ব্যবহার করা এবং তার পরিবর্তে উপযুক্ত হালকা বা মাঝারি তেল মজুতে নেওয়া। তবে এই প্রক্রিয়া কবে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে, কত পরিমাণ তেল এতে যুক্ত হবে এবং সাধারণ মার্কিন নাগরিক এর মাধ্যমে জ্বালানির দামে কতটা সুবিধা পাবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর