কোটি আমেরিকানের চালকের লাইসেন্স বিক্রির অভিযোগ, বিশাল তথ্যফাঁস তদন্তে নামল এফবিআই

অন্ধকার অনলাইন বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কোটি মানুষের পরিচয়পত্র বিক্রির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে এফবিআই, বাড়ছে পরিচয় চুরির আশঙ্কা।

কোটি আমেরিকানের চালকের লাইসেন্স বিক্রির অভিযোগ, বিশাল তথ্যফাঁস তদন্তে নামল এফবিআই

কোটি আমেরিকানের চালকের লাইসেন্স বিক্রির অভিযোগ, বিশাল তথ্যফাঁস তদন্তে নামল এফবিআই


যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কোটি মানুষের চালকের লাইসেন্স এবং অন্যান্য সরকারি পরিচয়পত্রের তথ্য অনলাইন অপরাধজগতে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। ২ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি জানিয়েছে, অন্ধকার অনলাইন বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মানুষের চালকের লাইসেন্সের ডিজিটাল কপি বিক্রি হওয়ার বিষয়ে পাওয়া প্রতিবেদনের তদন্ত চলছে। ঘটনাটি সত্য প্রমাণিত হলে উত্তর আমেরিকার সরকারিপরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁসের অন্যতম বড় ঘটনা হতে পারে। 

ঘটনাটি প্রথম নজরে আসে সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি বিষয়ে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিক ব্রায়ান ক্রেবসের প্রতিবেদনের মাধ্যমে। তিনি একটিঅন্ধকার অনলাইন বাজারে বিপুল সংখ্যক চালকের লাইসেন্স, পরিচয়পত্র, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত রেকর্ড বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখতে পান। তিনি কয়েকটি নথির সত্যতা যাচাই করে দেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিক্রি হওয়া তথ্যগুলো পুরোনো কোনো বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে চুরি করা স্থির তথ্য নয়—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, কিছু তথ্য যেন নিয়মিতভাবে হালনাগাদ হচ্ছে। এর অর্থ যদি সত্য হয়, তাহলে কোনো একটি উৎস থেকে তথ্য প্রবাহ এখনো চলমান থাকতে পারে। তবে তথ্যফাঁসের প্রকৃত উৎস এখনো নিশ্চিত হয়নি। 

ক্রেবসের অনুসন্ধানে যে অন্ধকার অনলাইন বাজারের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটির নাম ছিল নেক্সাস। সেখানে বিভিন্ন ধরনের সরকারি ও ব্যক্তিগত নথি বিক্রির তালিকা ছিল। চালকের লাইসেন্স ছাড়াও পরিচয়পত্র, ভ্রমণ নথি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এই ধরনের তথ্য সাধারণত পরিচয় চুরি, জালিয়াতি এবং প্রতারণার কাজে অপরাধীরা ব্যবহার করতে পারে। 

তথ্যফাঁসের মাত্রা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যভাবে কয়েক কোটি মানুষের তথ্য এতে জড়িত হতে পারে। তবে এফবিআই এখনো নিশ্চিত করে বলেনি যে সত্যিই এত বিপুল সংখ্যক মানুষের তথ্য চুরি হয়েছে। তাই ‘কয়েক কোটি মানুষের তথ্য নিশ্চিতভাবে চুরি হয়েছে’—এমন দাবি এখনই করা যাবে না। সঠিকভাবে বলা যায়, কোটি কোটি রেকর্ড বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। 

সাইবার নিরাপত্তা গবেষক জ্যাক এডওয়ার্ডস ঘটনাটিকে অত্যন্ত বড় মাত্রার বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, সরকারি পরিচয়পত্রের এত বড় পরিমাণ তথ্য একসঙ্গে পাওয়া গেলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পরিচয় চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। জাল পরিচয় তৈরি, আর্থিক প্রতারণা এবং বিভিন্ন অনলাইন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার মতো অপরাধেও এসব তথ্য ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। 

চালকের লাইসেন্সের তথ্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? যুক্তরাষ্ট্রে চালকের লাইসেন্স শুধু গাড়ি চালানোর অনুমতিপত্র নয়। এটি বহু ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যাংক, বিমা, ভাড়া বাড়ি, সরকারি সেবা এবং বিভিন্ন পরিচয় যাচাইয়ের সময় চালকের লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়। ফলে লাইসেন্সের উচ্চমানের ডিজিটাল কপি অপরাধীদের হাতে গেলে তা দিয়ে অন্য ব্যক্তির পরিচয়ে নানা ধরনের প্রতারণার চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তির চালকের লাইসেন্সের ছবি চুরি হয়েছে মানেই তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও চুরি হয়ে গেছে—এমন নয়। তথ্যফাঁসের ধরন এবং কোন কোন তথ্য চুরি হয়েছে তার ওপর ঝুঁকি নির্ভর করে। যদি লাইসেন্সের সঙ্গে নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, লাইসেন্স নম্বর এবং অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য থাকে, তাহলে পরিচয় চুরির ঝুঁকি বাড়তে পারে। 

এফবিআইয়ের তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সংস্থাটি তথ্যফাঁসের উৎস, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা তথ্য সরবরাহকারী ব্যবস্থা থেকে তথ্য বেরিয়ে যেতে পারে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর নেক্সাস নামের ওই অন্ধকার অনলাইন বাজারটি আর আগের মতো পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে কোনো একটি ওয়েবসাইট বা বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই তথ্য চুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন নয়। সাইবার অপরাধীরা প্রায়ই একটি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হলে অন্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। তাই তদন্তকারীদের জন্য তথ্যের উৎস শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনার সঙ্গে একটি পরিচয় যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের নামও আলোচনায় এসেছে। নিউ অরলিন্সভিত্তিক আইডিস্ক্যান ডটনেটের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেই তথ্য চুরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া এখনো সম্ভব নয়। 

তথ্যফাঁসের উৎস নিশ্চিত না হওয়ায় তদন্তকারীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোনো সরকারি সংস্থা, বেসরকারি পরিচয় যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান, তৃতীয় পক্ষের তথ্য সরবরাহকারী বা অন্য কোনো উৎস থেকে তথ্য বেরিয়ে থাকতে পারে। আবার একাধিক উৎসের তথ্য একত্র করেও অপরাধীরা বড় তথ্যভান্ডার তৈরি করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তথ্যগুলো এত দ্রুত হালনাগাদ হচ্ছে কীভাবে। যদি সত্যিই বাস্তব সময়ের কাছাকাছি সময়ে নতুন পরিচয়পত্রের তথ্য ওই বাজারে যুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে এর অর্থ হতে পারে কোনো তথ্যব্যবস্থায় চলমান অনুপ্রবেশ বা স্বয়ংক্রিয় তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বলা যাবে না। 

সাধারণ মানুষের জন্য এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পরিচয় চুরি। কারও লাইসেন্সের তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে তারা ওই ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা করতে পারে, জাল নথি তৈরি করতে পারে বা অন্য ধরনের প্রতারণা করতে পারে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী অনেক সময় দীর্ঘদিন পর বুঝতে পারেন যে তাঁর পরিচয় অপব্যবহার করা হয়েছে।
তাই যেসব আমেরিকান নাগরিক মনে করছেন তাঁদের পরিচয়পত্রের তথ্য কোনো তথ্যফাঁসে থাকতে পারে, তাদের ব্যাংক ও আর্থিক হিসাবের ওপর নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাভাবিক লেনদেন, নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার নোটিশ বা অপরিচিত ঋণসংক্রান্ত তথ্য দেখা গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জানানো উচিত। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি এই ফাঁসে আক্রান্ত হয়েছেন কি না, এফবিআই এখনো এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—দুই দেশের মানুষের তথ্য এতে থাকার অভিযোগ। দুই দেশের পরিচয়পত্র ব্যবস্থা আলাদা হলেও সীমান্তের দুই পাশে থাকা তথ্যের সমন্বয় অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হতে পারে। ফলে তথ্যফাঁসের উৎস ও পরিধি নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন হতে পারে। এখন পর্যন্ত তদন্তকারীরা তথ্যফাঁসের জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেনি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানি বা সরকারি সংস্থাকে ‘তথ্য চুরির জন্য দায়ী’ বলে দাবি করে, তা যাচাই ছাড়া সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তথ্যের উৎস এখনো নিশ্চিত হয়নি।

এ ধরনের তথ্যফাঁস শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে না; জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও তৈরি করতে পারে। সরকারি পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যাপকভাবে অপরাধীদের হাতে গেলে জাল পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা হতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা তাই ঘটনাটিকে বড় ধরনের উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন। 

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এখনো তদন্ত চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত হয়নি। ‘কোটি মানুষের তথ্য নিশ্চিতভাবে চুরি হয়েছে’ বলা এই মুহূর্তে অতিরঞ্জিত হবে। সঠিক তথ্য হলো, কোটি কোটি চালকের লাইসেন্সসহ পরিচয়পত্র বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং এফবিআই তা তদন্ত করছে।  সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মানুষের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সম্ভাব্য এই বিশাল তথ্যফাঁস নতুন করে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব সামনে এনেছে। অন্ধকার অনলাইন বাজারে চালকের লাইসেন্সের ডিজিটাল কপি বিক্রির অভিযোগ, তথ্যের সম্ভাব্য নিয়মিত হালনাগাদ এবং এফবিআইয়ের তদন্ত—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তথ্যফাঁসের প্রকৃত উৎস, পরিমাণ এবং দায়ী পক্ষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর