চীনের ২৪ যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ, ঋণের ফাঁদের দাবি কতটা সত্য?

চীনের ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনতে বাংলাদেশের আলোচনা, অর্থায়ন ও চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে এখনো রয়েছে নানা অনিশ্চয়তা।

চীনের ২৪ যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ, ঋণের ফাঁদের দাবি কতটা সত্য?

চীনের ২৪ যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ, ঋণের ফাঁদের দাবি কতটা সত্য?


চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আলোচনা এখন আর নিছক গুঞ্জন নয়; সরকার নিজেই জানিয়েছে, বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে এ ধরনের যুদ্ধবিমান ও আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে এবং একটি খসড়া চুক্তিও প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে ‘২৪টি যুদ্ধবিমান কেনা চূড়ান্ত’ এবং ‘আগামী এক দশক চীনের কাছে ঋণী থাকবে বাংলাদেশ’—এমন ভাষায় খবর ছড়াচ্ছে, তার সবটুকু এখনো নিশ্চিত সরকারি তথ্য নয়।

সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আধুনিক করার জন্য চতুর্থ প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমান, আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং মানববিহীন আকাশযান সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ও আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে একটি কমিটি আলোচনা করেছে এবং খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে। বাজেটের অর্থ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই কেনাকাটা এগোতে পারে; তা না হলে পরবর্তী বাজেটে বিষয়টি নেওয়া হতে পারে।

তবে এখানেই ২৪টি যুদ্ধবিমান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ২৪টি জে-১০সিই কেনার কথা বিবেচনা করছে বলে বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারি উপদেষ্টা নিজে যুদ্ধবিমানের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, মোট মূল্য কিংবা সরবরাহের সময়সূচি প্রকাশ করেননি। অর্থাৎ ২৪টি বিমান কেনার খবরটি আলোচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য সংখ্যা, চূড়ান্ত স্বাক্ষরিত চুক্তির সংখ্যা নয়।

এর আগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার একটি বড় পরিকল্পনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে সরকারি নথির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছিল, ২০টি যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে। এই প্যাকেজে শুধু বিমান নয়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও থাকার কথা বলা হয়েছিল।

ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ওই সম্ভাব্য ২০টি জে-১০সি যুদ্ধবিমানের অর্থ ১০ অর্থবছরে কিস্তিতে পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। এই পরিকল্পনা থেকেই পরবর্তীতে ‘দশ বছরের ঋণ’ বা ‘চীনের কাছে এক দশক ঋণী’—এ ধরনের বক্তব্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেটি ছিল পূর্ববর্তী ক্রয় পরিকল্পনার অর্থ পরিশোধ কাঠামো; ২০২৬ সালের বর্তমান আলোচনার চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে সেটিকে উপস্থাপন করা যাবে না।

অর্থাৎ ‘দশ বছর কিস্তি’ এবং ‘ঋণের ফাঁদ’—দুটি বিষয় এক নয়। কোনো বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে কেনা হলে ক্রেতা দেশ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করে। কিন্তু সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ঋণের ফাঁদ’ বলা যায় না। ঋণের সুদের হার, ঋণের প্রকৃত উৎস, জামানত বা শর্ত, মোট আর্থিক দায়, জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা—এসব বিশ্লেষণ না করে কোনো চুক্তিকে ঋণের ফাঁদ বলা অর্থনৈতিকভাবে যথাযথ নয়।

বাংলাদেশ কেন জে-১০সিইয়ের দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তার পেছনে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তা অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বর্তমান বহরের একটি বড় অংশ পুরোনো প্রজন্মের যুদ্ধবিমাননির্ভর। ফলে নতুন প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমান যুক্ত করার মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি এবং যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও নতুন বিমান কেনার ক্ষেত্রে একটি বাস্তব কারণ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই দশকে চীন বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌযানসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ফলে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আগে থেকেই একটি বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্ক রয়েছে। নতুন চীনা যুদ্ধবিমান কেনা হলে বিদ্যমান চীনা সরঞ্জামের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার কিছু সামঞ্জস্য পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

জে-১০সিই নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের আরেকটি কারণ হিসেবে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের কথা সরকারি পর্যায়ে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ওই সংঘাতে চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমানের কথিত কার্যকারিতা ঢাকা পর্যবেক্ষণ করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার বিষয়ে পাকিস্তানের দাবি বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে তিনি জানান। তবে সংঘাতের সময় কোন বিমান কীভাবে ভূপাতিত হয়েছিল—এ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই এটিকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যুদ্ধফল হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

দামের বিষয়টিও বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা বলেছেন, একই শ্রেণির ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমান তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল। ফলে সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেটের মধ্যে আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের ক্ষেত্রে জে-১০সিই বাংলাদেশের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হতে পারে।

তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অর্থায়নই সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি। সরকারি বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বাজেটের অর্থপ্রাপ্যতার ওপর ক্রয় প্রক্রিয়ার সময় নির্ভর করছে। অর্থাৎ সরকার এখনো এমন অবস্থায় নেই যেখানে বলা যায়—চুক্তি সম্পন্ন, টাকা ছাড় হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ২৪টি বিমান বাংলাদেশে আসছে। বরং বর্তমান পর্যায়ে খসড়া চুক্তি, আলোচনা ও বাজেট সংস্থানের বিষয়টি সামনে রয়েছে।

আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ২৪টি জে-১০সিইয়ের সম্ভাব্য ক্রয় এবং ২০টি জে-১০সিইয়ের আগের পরিকল্পনা—এই দুই তথ্যকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ২০টি বিমানের প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আবার সর্বোচ্চ ২৪টি বিমানের সম্ভাবনার কথা এসেছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে বর্তমান চূড়ান্ত সংখ্যা ও মূল্য প্রকাশ না হওয়ায় কোন সংখ্যা শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে থাকবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর