পাকিস্তানে প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনই অপুষ্টির শিকার: গভীর হচ্ছে পুষ্টি সংকট
পাকিস্তানে শিশুদের অপুষ্টি এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ ও পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতিতে ভুগছে। একই সঙ্গে প্রায় ১৭.৭ শতাংশ শিশু wasting বা তীব্র অপুষ্টির শিকার। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রায় ১ কোটি শিশু stunting এবং প্রায় ৫০ লাখ শিশু wasting-এ আক্রান্ত
পাকিস্তানে প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনই অপুষ্টির শিকার: গভীর হচ্ছে পুষ্টি সংকট
পাকিস্তানে শিশুদের অপুষ্টি এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ ও পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে বয়সের তুলনায় খর্বাকৃতিতে ভুগছে। একই সঙ্গে প্রায় ১৭.৭ শতাংশ শিশু wasting বা তীব্র অপুষ্টির শিকার। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রায় ১ কোটি শিশু stunting এবং প্রায় ৫০ লাখ শিশু wasting-এ আক্রান্ত।
পাকিস্তানের National Nutrition Survey (NNS) 2018—যা সরকার ও UNICEF-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এবং দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় পুষ্টি জরিপগুলোর একটি—এই সংকটের ব্যাপকতা তুলে ধরে। জরিপে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪০ শতাংশ stunted, ১৭.৭ শতাংশ wasted এবং ২৯ শতাংশ underweight।
শুধু খাবারের অভাব নয়, সংকটের পেছনে বহু কারণ
শিশুদের অপুষ্টির অন্যতম কারণ খাদ্যের পরিমাণ ও বৈচিত্র্যের ঘাটতি। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ৩৮ শতাংশের মতো শিশু জীবনের প্রথম ছয় মাস একচেটিয়াভাবে বুকের দুধ পায়। একই সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট—বিশেষ করে ভিটামিন, আয়রন, জিংক ও ভিটামিন ডি—থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
UNICEF-এর ২০২৪ সালের মানবিক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৮ শতাংশ শিশু severe food poverty এবং ৪৭ শতাংশ moderate food poverty-এর মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শিশু সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যময় খাবার নিয়মিত পাচ্ছে না। প্রায় ৬০ শতাংশ পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনাও সামর্থ্যের বাইরে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দারিদ্র্য, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং মায়েদের অপুষ্টি। UNICEF বলছে, গর্ভাবস্থায় মায়ের অপর্যাপ্ত পুষ্টি শিশুর stunting-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অর্থাৎ শিশুর অপুষ্টির সংকট অনেক ক্ষেত্রে জন্মের আগেই শুরু হয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বন্যা, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগ খাদ্য ও পুষ্টি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর UNICEF-এর মূল্যায়নে দেখা যায়, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, অপর্যাপ্ত শিশুখাদ্য, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের অভাব এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টিসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া শিশুদের acute malnutrition আরও বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যের দাম বাড়ে, পরিবারের আয় কমে এবং শিশুদের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ডিম, দুধ, ফল ও শাকসবজির পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও কম পুষ্টিকর খাবারের আধিপত্য তৈরি হয়।
অপুষ্টির আরেক ভয়াবহ চিত্র: রক্তস্বল্পতা ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি
পাকিস্তানের শিশুদের মধ্যে শুধু ওজন ও উচ্চতার ঘাটতিই নয়, রক্তস্বল্পতা ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতিও ব্যাপক। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার হার ৫৩.৭ শতাংশ এবং প্রায় ৪৯.১ শতাংশ শিশু iron deficiency-তে আক্রান্ত ছিল।
এর ফলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই stunting শুধু একটি স্বাস্থ্য-সূচক নয়; এটি একটি দেশের মানবসম্পদের মানের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
অর্থনীতিতেও বড় ক্ষতি
শিশু অপুষ্টির প্রভাব পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। ২০২৫ সালের জাতিসংঘের এক বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তানে অপুষ্টির কারণে বছরে প্রায় ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশটির মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৬.৪ শতাংশের সমান।
অর্থাৎ অপুষ্টির কারণে আজ যে শিশু শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পিছিয়ে পড়ছে, ভবিষ্যতে তার শিক্ষা, কর্মক্ষমতা ও আয় করার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এর সম্মিলিত প্রভাব দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোগ, কিন্তু চ্যালেঞ্জ বড়
পাকিস্তান সরকার, UNICEF, WHO এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা পুষ্টি কর্মসূচি, চিকিৎসা, ভিটামিন এ সরবরাহ, breastfeeding promotion এবং severe acute malnutrition-এর চিকিৎসায় কাজ করছে। UNICEF-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরে ৩ লাখ ৪ হাজার শিশু severe acute malnutrition-এর চিকিৎসা পেয়েছে এবং ৩ কোটি ৭৩ লাখ শিশু ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট পেয়েছে।
তবে আক্রান্ত শিশুর বিপুল সংখ্যার তুলনায় এই উদ্যোগগুলো এখনও পর্যাপ্ত নয়। UNICEF-এর হিসাব অনুযায়ী, severe acute malnutrition-এর চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ঐতিহাসিকভাবে মোট আক্রান্ত শিশুর তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ছিল। ফলে সংকট মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা নয়—খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, কৃষি উৎপাদন এবং জলবায়ু সহনশীলতা—সবকিছুকে একই নীতির আওতায় আনতে হবে।
পাকিস্তানের শিশুদের অপুষ্টি আসলে একটি বহুমাত্রিক সংকট। প্রতি ১০ জনে প্রায় ৪ জন পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর stunting এবং প্রায় প্রতি ৬ জনে একজনের wasting দেশটির পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকটের সঙ্গে দারিদ্র্য, খাদ্য মূল্য, মাতৃ অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও স্যানিটেশন সমস্যা এবং জলবায়ু দুর্যোগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই পাকিস্তানের জন্য শিশু পুষ্টিকে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না; এটি একই সঙ্গে অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও জলবায়ু নীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ওপর। সেই জায়গা থেকে পাকিস্তানের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর stunting-এর তথ্য দেশটির জন্য নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানবসম্পদ নিয়ে একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
তথ্যসূত্র: Pakistan Government–UNICEF National Nutrition Survey 2018; UNICEF State of Children in Pakistan 2024; UNICEF Pakistan Annual Report 2025; United Nations Pakistan/WHO; UNICEF Pakistan nutrition and food-poverty report 2026.