সংসদ ভবনে ফাটল, ছাদ চুইয়ে ঢুকছে বৃষ্টির পানি, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা
দেশের আইন প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভবনেই ফাটল ও বৃষ্টির পানি, নিরাপত্তা নিয়ে সংসদে উঠেছে গুরুতর উদ্বেগের প্রশ্ন।
সংসদ ভবনে ফাটল, ছাদ চুইয়ে ঢুকছে বৃষ্টির পানি, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন—দেশের আইন প্রণয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। অথচ এই ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেওয়া এবং বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি শুধু ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না, বরং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০২৬ সালের ২২ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম রাশেদ জাতীয় সংসদ ভবনের বিভিন্ন স্তরে ফাটল এবং বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার মতো অবকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি ভবনের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত ও টেকসই সংস্কারের দাবি জানান।
ওই দিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পর স্পিকার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরকে প্রয়োজনীয় ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে নোটিশটি সংসদ সচিবালয়-সংক্রান্ত হওয়ায় বিধি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
এরপর জুলাই মাসে ভারী বৃষ্টির সময় সংসদ ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ার বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে সরকারি দলের হুইপ জি কে গউছ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদ ভবনের মসজিদসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির পানি ছাদ চুইয়ে ভেতরে ঢুকছিল। পরিস্থিতির এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পানি আটকাতে সেখানে বালতি রাখার প্রয়োজন হয়।
বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়ে যখন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল নিজেই সংসদ ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ার ঘটনা সত্য বলে জানান। তিনি বলেন, শুধু সংসদ ভবনের অন্য অংশ নয়, বৃষ্টির দিনে তাঁর নিজের কক্ষের ছাদ থেকেও পানি পড়ে। পানি আটকাতে তাঁকেও ঘরের মেঝেতে বাটি রাখতে হয়। তাঁর এই বক্তব্য সংসদ কক্ষে আলোচনার পাশাপাশি ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের বাস্তব চিত্র নিয়েও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
হুইপ জি কে গউছ বিশেষভাবে সংসদ ভবনের মসজিদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মসজিদের সামনে সারিবদ্ধভাবে বালতি রাখা হয়েছিল, কারণ ছাদ ফেটে বৃষ্টির পানি ভেতরে প্রবেশ করছিল। এমন একটি স্থাপনায় এ ধরনের পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো এবং দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি সরকারি অফিস ভবন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও স্থাপত্য ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থপতি লুই কানের নকশায় নির্মিত এই ভবনটি দেশের অন্যতম পরিচিত স্থাপত্য নিদর্শন। ফলে ভবনের কোথাও ফাটল, ছাদ চুইয়ে পানি পড়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলে সেটিকে সাধারণ কোনো ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে সংসদ ভবনে ফাটল ও পানি পড়ার ঘটনা উল্লেখ করা হলেও, এসব প্রতিবেদনে ভবনটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়বে বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী—এমন কোনো সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি ‘সংসদ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা’ বা ‘যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা’ ধরনের দাবি ছড়িয়ে থাকে, সেগুলোকে সরকারি প্রকৌশলগত মূল্যায়ন ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
জুলাইয়ের প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, পানি পড়ার সমস্যার সমাধানে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চিফ হুইপ জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং ভবনের যেসব জায়গা দিয়ে পানি পড়ছে, সেগুলোর মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের আশাবাদও ব্যক্ত করা হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রীও ছাদ সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মূল প্রশ্ন এখন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার ব্যবস্থাপনা নিয়ে। একটি ঐতিহাসিক ভবনের নিয়মিত পরিদর্শন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ছাদ ও কাঠামোগত অংশের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি ঢোকার ঘটনা ভবনের ভেতরের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, দেয়াল, ছাদ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
২২ জুনের আলোচনায় সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম রাশেদ ভবনের বর্তমান অবস্থাকে নাজুক উল্লেখ করে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। পরে জুলাইয়ের ঘটনায় একই সমস্যার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ বিষয়টি একদিনের বৃষ্টিতে হঠাৎ তৈরি হওয়া সমস্যা নয়; অন্তত কয়েক মাসের ব্যবধানে সংসদে একই ধরনের অবকাঠামোগত সমস্যার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
এখন প্রয়োজন হলো ভবনের প্রকৃত কাঠামোগত অবস্থা নিয়ে পেশাদার প্রকৌশলগত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সংস্কার। কোথায় ফাটল, কেন পানি ঢুকছে, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় সমস্যা আছে কি না এবং ভবনের কোন অংশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কারিগরি প্রতিবেদনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংসদ ভবনে পানি পড়ার ঘটনাটি তাই কেবল হাস্যরসের ‘বাটি রাখার’ গল্প নয়। এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে নির্ভরযোগ্য প্রকৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ ফাটল ও পানি চুইয়ে পড়ার ঘটনা বাস্তব হলেও, এর ফলে বড় দুর্ঘটনা ঘটবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তাই ঘটনাটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করাই এখন মূল দাবি।