ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ফের তীব্র, পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণ, হরমুজ ঘিরে উত্তেজনায় বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ফের তীব্র, পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক বিরতির পর আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাত তীব্র হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা ছিল জুলাইয়ের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘর্ষগুলোর একটি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে আবার বড় আকারের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক সম্পদ, মাইন পাতা সক্ষমতা এবং যোগাযোগব্যবস্থা ছিল বলে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এর পর ইরানও পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে। তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করেছে। জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলার খবর পাওয়া গেছে। তবে ইরান যে মার্কিন সেনাদের বড় সংখ্যায় হত্যা করেছে—এমন কিছু দাবি মার্কিন কর্মকর্তারা অস্বীকার করেছেন। প্রাথমিক মার্কিন মূল্যায়নে ওই হামলায় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের কারণে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও জ্বালানি দামের বড় প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন করে সামরিক সংঘাতের কারণে তেলের দামও বেড়েছে। ২ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ দশমিক ৭৬ ডলারে উঠেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দামও বেড়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলা সঠিক নয়। সামরিক উত্তেজনার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং ঝুঁকি বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংঘাত শুরু হওয়ার পরও ওই জলপথ দিয়ে একদিনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়েছে। ফলে ‘হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ’—এমন কোনো সাধারণ দাবি করলে সেটি বিভ্রান্তিকর হবে।
ইরানের অর্থনীতিতেও যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌ অবরোধ ও সামরিক চাপের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল দৈনিক থেকে রপ্তানি ২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য বাড়ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতকে আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়া থেকে ঠেকাতে চাইছেন। প্রশাসনের ভেতরে এমন উদ্বেগ রয়েছে যে দীর্ঘ যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান আলোচনায় ফেরার আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা এখনো কঠিন।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো ভুল তথ্য। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও ছড়িয়েছে, যেগুলোর সবগুলোর সময় ও স্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে যুদ্ধের সময় সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ভিডিও বা দাবি সরাসরি সত্য হিসেবে প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের সামরিক লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি। নতুন কোনো বড় হামলা হলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও বিস্তৃত হতে পারে।