কিয়েভে টানা সপ্তম দিনের রুশ হামলা, আহত ১১ জন, বাড়ছে আতঙ্ক

ইউক্রেনের রাজধানীতে টানা সপ্তম দিনের রুশ ড্রোন হামলায় ১১ জন আহত, আবাসিক ও বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কিয়েভে টানা সপ্তম দিনের রুশ হামলা, আহত ১১ জন, বাড়ছে আতঙ্ক

কিয়েভে টানা সপ্তম দিনের রুশ হামলা, আহত ১১ জন, বাড়ছে আতঙ্ক


ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ধারাবাহিক ড্রোন হামলা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে প্রায় টানা হামলার সপ্তম দিনে রুশ ড্রোন আঘাতে অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। আবাসিক ভবন ও একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


রয়টার্স জানিয়েছে, কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন বিমান হামলা অভিযান কয়েক দিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। হামলার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। 


ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রুতগতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করা। রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। বিশেষ করে জেটচালিত দ্রুতগতির ড্রোন প্রতিরোধ করা ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কিয়েভে হামলার সময় সাধারণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও আগুনের খবর পাওয়া যায়। উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং আহতদের উদ্ধারের কাজ করেন।


রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিয়েভের পাশাপাশি ইউক্রেনের অন্য এলাকাতেও রুশ হামলা হয়েছে। ওডেসা ও অন্যান্য অঞ্চলের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আরও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছেন। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিয়েভের আগ্রহ বেশি। কারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় এ ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


গত কয়েক মাসে রাশিয়ার আকাশ হামলায় শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, বন্দর, শিল্প এলাকা, গুদাম এবং ব্যবসায়িক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। এর ফলে যুদ্ধের সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে।

আগস্টের শেষ সপ্তাহে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ হামলায় খাদ্যগুদাম, শিল্প ও খুচরা ব্যবসার সরবরাহকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, রুশ বাহিনী এমন স্থাপনাও লক্ষ্য করছে যেগুলো সাধারণ মানুষের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। 


তবে যুদ্ধের উভয় পক্ষই নিজেদের হামলাকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে এবং প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে আলাদা দাবি করে। তাই কোনো হামলায় নির্দিষ্টভাবে কোন স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়েছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই না করে নিশ্চিতভাবে বলা উচিত নয়।


ইউক্রেনের জন্য আরেকটি উদ্বেগ হলো বেসামরিক বিমান চলাচল। রাশিয়ার আকাশসীমায় সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করেছেন যে রাশিয়ার আকাশসীমা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া অবশ্য বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঠেকানোর কথা জানিয়েছে।


এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার জন্য আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আলোচনা চলছে। 


যুদ্ধের কূটনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দফা আলোচনা হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা রয়ে গেছে। ইউক্রেন তার ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা চায়, অন্যদিকে রাশিয়া নিজেদের নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডসংক্রান্ত দাবিকে গুরুত্ব দেয়।


সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্বকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। ইউক্রেন অবশ্য রাশিয়ার এসব দাবির বিরোধিতা করে।


যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাবও তত গভীর হচ্ছে। বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা, ব্যবসা ও আবাসিক জীবন—সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। রাজধানীর মতো বড় শহরেও যদি নিয়মিত ড্রোন হামলা চলতে থাকে, তাহলে অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

কিয়েভে টানা সপ্তম দিনের হামলা তাই শুধু আরেকটি সামরিক ঘটনা নয়; এটি দেখাচ্ছে যে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর্যায়ে রয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল না হলে সামনের দিনগুলোতে আরও হামলা এবং পাল্টা হামলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর