ফের হামলা হলে ইরানকে ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের, বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের শঙ্কা
ইরান ফের হামলা চালালে ভয়াবহ জবাবের হুমকি ট্রাম্পের, পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়াচ্ছে বড় সংঘাতের আশঙ্কা।
ফের হামলা হলে ইরানকে ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের, বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা মার্কিন স্বার্থে আরও হামলা হলে ওয়াশিংটনের জবাব ভয়াবহ হতে পারে—এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ বা ‘চূর্ণ-বিচূর্ণ’ করার মতো কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছিলেন।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক বিরতির পর আবারও সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। রয়টার্সের ২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন দফায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক সম্পদ, মাইন পাতা সক্ষমতা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করা হয়েছে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে থাকা মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে থাকা মার্কিন সম্পদের ওপর হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর সংঘাত আবারও বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
২ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে তেলের দামও বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের ওপরে উঠেছিল। হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি সৌদি তেলবাহী সুপারট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি জাহাজই সৌদি আরব থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা সংঘাত আরও না বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে সামরিক উত্তেজনা কম রাখার বিষয়টিও প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন ও মিত্রদের ওপর আরও হামলা চালানোর ঝুঁকি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশের ওপরই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে সংঘাতের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং জ্বালানি দামের চাপও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে।
এদিকে ইরানও চাপে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অবরোধ এবং সামরিক হামলার কারণে দেশটির তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও ভারতের কূটনৈতিক সমর্থন থাকলেও ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কোনো পক্ষ যদি নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি, তেল স্থাপনা, বাণিজ্যিক জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ আক্রান্ত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
তবে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সময় মধ্যস্থতার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সামরিক হামলা, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—এসব প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানের বড় পার্থক্য এখনো রয়েছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—দুই পক্ষ সংঘাত আরও বাড়াবে, নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সামরিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করবে।