হরমুজ প্রণালির নাম নিজের নামে করার প্রস্তাব দিলেন ট্রাম্প, তীব্র চাঞ্চল্য বিশ্বজুড়ে
ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালির নাম বদলে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করার প্রস্তাব দিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করলেন ট্রাম্প।
হরমুজ প্রণালির নাম নিজের নামে করার প্রস্তাব দিলেন ট্রাম্প, তীব্র চাঞ্চল্য বিশ্বজুড়ে
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালির নাম পরিবর্তন করে নিজের নামে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করা এই জলপথের নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করা উচিত কি না।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালি কোনো সাধারণ জলপথ নয়। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই সরু সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে প্রণালিটি নিয়ে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলেই তার প্রভাব সরাসরি আন্তর্জাতিক তেলবাজার, জাহাজ চলাচল এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যেহেতু এখন এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাই হরমুজ প্রণালির নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ করা যায় কি না। তিনি মন্তব্যের সঙ্গে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে নতুন নামটি যুক্তরাষ্ট্রের মতোই আরও ‘উত্তপ্ত’ হয়ে উঠবে। তাঁর এই বক্তব্যের ভাষা অনেকটা রসিকতাপূর্ণ হলেও এর পেছনে বর্তমান সামরিক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালির নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করা হয়নি। ট্রাম্প মূলত নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে প্রস্তাব বা প্রশ্ন তুলেছেন।
আন্তর্জাতিকভাবে জলপথটির প্রচলিত নাম এখনো হরমুজ প্রণালিই রয়েছে। তাই ‘হরমুজ প্রণালির নাম ট্রাম্প প্রণালি হয়ে গেছে’—এমন দাবি সঠিক নয়। হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এর একদিকে রয়েছে ইরান, অন্যদিকে ওমানের ভূখণ্ড এবং জলসীমা। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রণালিটি বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চাপ দেখা দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু এই দাবি ইরান মেনে নেয়নি। বরং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকায় প্রণালিটি কার্যত সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার পর হরমুজকে ঘিরে জাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের কাছে ট্রাম্পের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব তাই শুধু একটি রসিকতা নয়; এর মধ্যে তাঁর প্রশাসনের হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কৌশলগত অবস্থানের ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই দাবি করে আসছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সর্বশেষ মন্তব্যে সেই দাবির ভিত্তিতেই তিনি প্রণালিটির নাম নিজের নামে করার প্রশ্ন তুলেছেন।
এই বক্তব্যের সময়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের নতুন দফা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে, অন্যদিকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনাও বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণে এই অঞ্চলে কোনো দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই কারণেই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। কোনো একটি দেশ একতরফাভাবে এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ট্রাম্পের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
ট্রাম্পের বর্তমান নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব তাঁর আগের কয়েকটি ভৌগোলিক নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর আগে তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সম্প্রতি লেক অন্টারিওর নাম ‘আমেরিকা হ্রদ’ করার উদ্যোগও নিয়েছেন। কানাডা এসব পরিবর্তন মেনে নেয়নি।
হরমুজের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ড নয় এবং জলপথটির সঙ্গে ইরান ও ওমানের ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক অধিকার সরাসরি জড়িত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেই আন্তর্জাতিকভাবে সেই নাম স্বীকৃত হয়ে যাবে—এমন কোনো বিষয় নেই।
এদিকে হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারও গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এখানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যেই তেলের বাজারে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালির নাম পরিবর্তনের চেয়ে বর্তমানে বড় প্রশ্ন হলো—এই জলপথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কবে পুরোপুরি ফিরবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাত কোন দিকে যাবে। কারণ নাম পরিবর্তনের বিতর্কের আড়ালে প্রকৃত সংকট হলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।
ট্রাম্পের বক্তব্য ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। কেউ এটিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে হরমুজ প্রণালি নামেই পরিচিত এবং ‘ট্রাম্প প্রণালি’ কোনো স্বীকৃত সরকারি নাম নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, ঠিক সেই সময় ট্রাম্পের এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে বাধা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে নাম পরিবর্তনের প্রশ্নও। আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবকে বাস্তবে কোনো সরকারি উদ্যোগে রূপ দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।