তীব্র খরায় ইউরোপের ভুট্টাক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে, বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা

হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ায় তীব্র খরায় ভুট্টার ফলন ক্ষতিগ্রস্ত, কৃষকেরা বলছেন জলবায়ুর পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করছে।

তীব্র খরায় ইউরোপের ভুট্টাক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে, বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা

তীব্র খরায় ইউরোপের ভুট্টাক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে, বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা


ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান অঞ্চল হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ায় তীব্র খরার কারণে ভুট্টার উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক ক্ষেতের গাছ শুকিয়ে গেছে।


রয়টার্সের প্রতিবেদনে উত্তর-পূর্ব হাঙ্গেরির কৃষকদের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে অনেক ভুট্টাক্ষেতের গাছ স্বাভাবিক সময়ের আগেই বাদামি হয়ে গেছে এবং মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ খুব কমে গেছে।ভুট্টা ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের একটি। এটি মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি পশুখাদ্য এবং বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা হয়। ফলে উৎপাদন কমে গেলে শুধু কৃষকের আয় নয়, খাদ্য ও পশুখাদ্যের বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।


খরার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কৃষকের হাতে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক কিছু করার সুযোগ থাকে না। বৃষ্টি না হলে সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বড় কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জ্বালানি, পানি এবং শ্রমের খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। অন্যদিকে ফলন কমে গেলে আয় কমে যায়। ফলে একই সঙ্গে আয় কমা ও খরচ বাড়ার চাপ তৈরি হয়।


হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার কৃষি অঞ্চলে সাম্প্রতিক আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ইউরোপ বিশ্বের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর একটি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।


রয়টার্সের জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে আবহাওয়া ও জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতির কারণে গত কয়েক দশকে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়ছে।কৃষকের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হলো খরা যদি শুধু একটি মৌসুমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির ঘাটতি হলে মাটির গুণগত মান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং কৃষি উৎপাদনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।


এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের নতুন জাতের ফসল, পানি সংরক্ষণ, উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং খরা সহনশীল কৃষিপদ্ধতির দিকে যেতে হতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য অর্থ প্রয়োজন। বড় কৃষকরা হয়তো আধুনিক সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারেন, কিন্তু ছোট কৃষকদের জন্য তা অনেক বেশি কঠিন।


ফসলের উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ কমতে পারে। সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।বিশেষ করে পশুখাদ্যের দাম বাড়লে মাংস, দুধ ও অন্যান্য প্রাণিজ খাদ্যের দামেও পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো তাই এখন শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে একই সময়ে অতিবৃষ্টি ও তীব্র খরা—দুই ধরনের পরিস্থিতিই বাড়তে পারে। একটি অঞ্চলে বন্যা হলেও অন্য অঞ্চলে পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।


হাঙ্গেরির কৃষকেরা বর্তমানে তাদের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে সেই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন। যে ভুট্টাগাছ থেকে ভালো ফলনের আশা ছিল, তার অনেকগুলোই পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় শুকিয়ে যাচ্ছে।এটি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য সরবরাহ, বাজারদর এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও প্রভাব পড়ে।


ইউরোপের কৃষিকে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হলে পানি ব্যবস্থাপনা, ফসলের বৈচিত্র্য এবং কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান খরা তাই একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখা হলেও এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত এখন সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র হয়ে উঠেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর