ফ্লোরিডায় ছয় বছর ট্রাকের কেবিনে বন্দি চার শিশু, দুই নারীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও ভয়াবহ অবহেলার অভিযোগ
ফ্লোরিডায় ট্রাকের কেবিনে ছয় বছর বন্দি চার শিশু, দুই নারীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, মারধর ও চরম অবহেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ফ্লোরিডায় ছয় বছর ট্রাকের কেবিনে বন্দি চার শিশু, দুই নারীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও ভয়াবহ অবহেলার অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চার শিশুকে একটি বাণিজ্যিক ট্রাকের কেবিনে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে রেখে যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন ও চরম অবহেলার অভিযোগে দুই নারীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমেয়ার মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, এই মামলায় ৩৭ বছর বয়সী তামরা মার্শন স্টুয়ার্ট এবং ৫১ বছর বয়সী আটলান্টার বাসিন্দা কেইশা মনিক এপসের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের কথা জানান। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এপস একজন বাণিজ্যিক ট্রাকচালক ছিলেন এবং স্টুয়ার্ট শিশুদের অন্যতম প্রধান দেখাশোনাকারী ছিলেন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চার শিশু ওই দুই নারীর সঙ্গে একটি সেমি-ট্রাকের স্লিপার কেবিনে বসবাস করত। ট্রাকটি আটলান্টা থেকে মায়ামি পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে চলাচল করত এবং ফ্লোরিডার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে অরল্যান্ডো এলাকায়ও যাতায়াত করত। ফলে শিশুরাও দীর্ঘ সময় ধরে চলন্ত ট্রাকের কেবিনেই থাকত।
চার শিশুর মধ্যে ছিল দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগের সময় তাদের বয়স ছিল আনুমানিক ৫ থেকে ৯ বছরের মধ্যে। তদন্তকারীদের মতে, শিশুদের চারজনকে একটি মাত্র ছোট বাঙ্কে ঘুমাতে হতো। পর্যাপ্ত খাবার, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, শিশুদের অনেক সময় ট্রাকের কেবিনের বাইরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার সুযোগ দেওয়া হতো না। এমনকি দুই নারী বিশ্রামকেন্দ্রে গোসল করতে গেলে শিশুরা ট্রাকের ভেতরেই থাকত বলে তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে। ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল ঘটনাটিকে শিশুদের জন্য একটি ‘চলন্ত কারাগার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
মামলাটির সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো যৌন নির্যাতন। তদন্তকারীদের দাবি, দুই মেয়ে বছরের পর বছর ধরে স্টুয়ার্টের হাতে যৌন নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। দুই ছেলে ওই নির্যাতনের ঘটনা দেখেছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করার পর তাদের মারধর করা হয়েছিল বলেও তদন্তে অভিযোগ উঠে এসেছে।
কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এপস এসব নির্যাতনের বিষয়ে জানতেন, কিন্তু তা বন্ধ করা বা আইন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষকে জানানোর ব্যবস্থা করেননি। তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্টুয়ার্ট নাকি একটি মেয়ের ওপর তিনটি যৌন নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করেছেন। তবে এসব তথ্য এখনো আদালতে বিচারাধীন অভিযোগের অংশ এবং অভিযুক্তদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
শুধু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নয়, শিশুদের শারীরিক অবস্থাও তদন্তকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই শিশুর শরীরে পোড়ার চিহ্ন ছিল এবং সেই পোড়া জায়গাগুলো যথাযথভাবে চিকিৎসা না পাওয়ায় স্থায়ী দাগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তাদের হেফাজত থেকে বের হওয়ার পর একজন শিশুর শরীরে যৌনবাহিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল বলেও ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে।
তদন্তে শিশুদের শিক্ষা থেকেও দীর্ঘ সময় বঞ্চিত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তদন্ত-তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের প্রায় পাঁচ বছর স্কুলে যেতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিধি ও স্বাভাবিক শিশুজীবনের অন্যান্য মৌলিক সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল বলে তদন্তকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযুক্ত তামরা স্টুয়ার্টের বিরুদ্ধে পারিবারিক বা হেফাজতকারী কর্তৃত্বের অধীনে যৌন নির্যাতন, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে যৌন নিপীড়ন এবং শিশু অবহেলার একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে কেইশা এপসের বিরুদ্ধেও যৌন নির্যাতন, শিশু অবহেলা এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা জানাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরও অভিযোগ যুক্ত হতে পারে। শিশুদের কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক ব্যবস্থার বাইরে রাখা সম্ভব হলো, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চার শিশু দীর্ঘ সময় ধরে একই ট্রাকের কেবিনে বসবাস করেছে বলে তদন্তকারীরা অভিযোগ করলেও, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কর্তৃপক্ষ এখন ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।
মামলাটি বর্তমানে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তাই অভিযুক্ত দুই নারীকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। তদন্ত শেষ হলে মামলার আরও তথ্য প্রকাশ পেতে পারে।