জি২০ বৈঠকে চীনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে বৈশ্বিক চাপ

জি২০ বৈঠকে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানি নিয়ে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের, বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্য ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানাল ওয়াশিংটন।

জি২০ বৈঠকে চীনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে বৈশ্বিক চাপ

জি২০ বৈঠকে চীনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্র, বাড়ছে বৈশ্বিক চাপ


যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জি২০ বৈঠকে অন্যান্য দেশকে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানির প্রভাব মোকাবিলায় আরও পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীনের ভর্তুকিনির্ভর উৎপাদন এবং ব্যাপক রপ্তানি বৈশ্বিক বাজারে ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং অন্যান্য দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত সেপ্টেম্বরের জি২০ বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। ওয়াশিংটনের মতে, চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় দেশটির উৎপাদন খাত অতিরিক্ত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, চীনা পণ্যের এই প্রবাহ অন্যান্য দেশের স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলছে।


বেসেন্ট জি২০ দেশগুলোকে নিজেদের শিল্প ও শ্রমবাজার রক্ষার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিরোধ নয়; এটি পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, যদি কোনো একটি দেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করে কম দামে বিশ্ববাজারে পাঠাতে থাকে, তাহলে অন্যান্য দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে পারে।


চীনের ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্রযুক্তি, ব্যাটারি, ইস্পাত এবং অন্যান্য শিল্পখাতে চীনা উৎপাদনের দ্রুত সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চীনের পক্ষ থেকে অবশ্য এসব অভিযোগের অনেকটাই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বেইজিং সাধারণত যুক্তি দেয় যে তার শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মূলত উৎপাদন দক্ষতা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বড় বাজারের ওপর নির্ভরশীল।


জি২০ বৈঠকে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগও সামনে এসেছে। ইউরোপের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কিছু শিল্পখাত চীনা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চাপ অনুভব করছে। 


ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের সঙ্গে ইউরোপের কিছু উদ্বেগের মিল থাকলেও, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করা হবে সে বিষয়ে দুই পক্ষের নীতি সবসময় এক নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার সম্পর্ক। ওয়াশিংটন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ওপর প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে চীনও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কাঁচামালের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।


জি২০ বৈঠকে রাশিয়ার উপস্থিতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু চীনের বাণিজ্য ইস্যু নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে জি২০ সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হয়ে উঠছে।


বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে। কোনো দেশ শুল্ক বাড়ালে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আবার কোনো দেশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ব্যবসায়িক ব্যয়, পণ্যের মূল্য এবং কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বাণিজ্যনীতির এই দিকটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।


চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ইতোমধ্যেই বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং জাতীয় নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে উত্তেজনাপূর্ণ। নতুন করে জি২০-তে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে চাপ সৃষ্টি সেই সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করাও বাস্তবসম্মত নয়, কারণ দুই দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।


আগামী দিনে জি২০ দেশগুলো যৌথভাবে কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করে এবং চীনের নাম সরাসরি কোনো বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাণিজ্য ভারসাম্য ও বাজার বিকৃতি নিয়ে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে কিছু দেশ চায় বিষয়টি যেন অতিরিক্ত রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত না হয়।


অ্যাশভিলে জি২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী বাণিজ্য চাপ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এই চাপ যদি শুল্ক, আমদানি নিয়ন্ত্রণ বা অন্যান্য বাণিজ্যিক পদক্ষেপে রূপ নেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বজুড়ে ব্যবসা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভোক্তা বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর