ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ হামলা, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই আহত শিশুসহ নিহত ১২

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, শিশুদের হতাহতের খবরে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ হামলা, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই আহত শিশুসহ নিহত ১২

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ হামলা, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই আহত শিশুসহ নিহত ১২


রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই হামলার কারণে কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 


রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রাশিয়ার টানা ষষ্ঠ দিনের বিমান হামলা চলে। হামলায় রাজধানীতে আটজন নিহত হন এবং কিয়েভের বাইরে বরিসপিল এলাকায় আরও চারজন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে আবাসিক ভবন, রেল অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 


হামলার সময় কিয়েভের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকলেও বেশ কয়েকটি স্থানে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। রয়টার্স জানিয়েছে, কিয়েভের একটি রেল স্থাপনায় হামলায় বেশ কয়েকজন রেলকর্মী নিহত হয়েছেন।


এবারের হামলার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এটি ইউক্রেনের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর দিনেই হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর দেশটির লাখ লাখ শিশু নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে স্কুলে ফেরে। কিন্তু কিয়েভে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠায় অনেক শিক্ষার্থীকে অনুষ্ঠান ও ক্লাস ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। 


অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, কিয়েভের বিভিন্ন স্কুলে নতুন শিক্ষাবর্ষের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন শুরু হলেও বিমান হামলার সতর্কসংকেতের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের শিক্ষাব্যবস্থা ইতোমধ্যে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। 


কিয়েভের শিক্ষার্থীদের জন্য যুদ্ধ এখন আর শুধু সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্কুলকে বাংকার বা ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। কোথাও আবার অনলাইন ও সরাসরি শিক্ষার সমন্বিত ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। 


এপি জানিয়েছে, কিয়েভে যুদ্ধের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। রাজধানীতেই শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক পাঠ্যবই ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বাইরে চলে গেছে অথবা নিরাপদ অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে।


সাম্প্রতিক হামলায় শুধু আবাসিক এলাকা নয়, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইউক্রেনের রেলব্যবস্থা যুদ্ধকালীন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া, পণ্য পরিবহন এবং দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতে রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই রেল অবকাঠামোয় হামলা হলে এর প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ে। 


গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিয়েভের একটি রেল ডিপোতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনায় কয়েকজন রেলকর্মী নিহত হন। ইউক্রেনের রেল নেটওয়ার্কে রাশিয়ার হামলা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে এবং এতে দেশটির পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।


এদিকে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, হামলায় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এপি জানিয়েছে, রাশিয়া ২১৮টি ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ডিকয় ব্যবহার করেছে বলে ইউক্রেন দাবি করেছে। হামলার প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে কিয়েভ ও ওদেসা অঞ্চল ছিল।


রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। তবে দ্রুতগতির নতুন ধরনের ড্রোন মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠছে। ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আরও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছে। 


 ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু হামলা প্রতিহত করা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা। রাশিয়া যদি একই সঙ্গে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে প্রতিটি হামলা প্রতিহত করতে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হয়।


কিয়েভের বাইরে বরিসপিল এলাকাতেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সেখানে একটি আবাসিক ভবন ও ব্যবসায়িক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। 


হামলার প্রভাব রাজধানীর বাইরে ওদেসা অঞ্চলেও পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়ার হামলায় ওদেসা অঞ্চলের বন্দর অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং রোমানিয়ার সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইউক্রেনের রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।


ইউক্রেনের জন্য বন্দর ও রেল অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির শস্য ও অন্যান্য পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রে কৃষ্ণসাগর ও দানিউব অঞ্চলের বন্দরগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলা হলে শুধু ইউক্রেনের অর্থনীতি নয়, আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে। 


অন্যদিকে রাশিয়া দাবি করছে, তাদের হামলার লক্ষ্য সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা। তবে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এই পার্থক্য যুদ্ধের তথ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।


এবারের হামলার সময়কালও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কিয়েভে টানা ছয় দিন ধরে হামলা চলেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এত ধারাবাহিক বিমান হামলা রাজধানীর মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।


নতুন শিক্ষাবর্ষের দিনে হামলার ফলে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক বাবা-মা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। ইউক্রেনের স্কুলগুলোকে তাই শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও রাখতে হচ্ছে।


এপি জানিয়েছে, ইউক্রেনের শিক্ষাব্যবস্থা যুদ্ধের পঞ্চম শিক্ষাবর্ষে প্রবেশ করেছে। বহু শিক্ষার্থী যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিক স্কুলজীবন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিছু শিশু কখনোই যুদ্ধের বাইরে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা পায়নি। 


এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন স্কুলগুলোতে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। যেখানে সরাসরি ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।


যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে সাম্প্রতিক হামলার ধারাবাহিকতা শান্তি আলোচনার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।


কিয়েভে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই ভয়াবহ হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের মানবিক দিকটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। শিশুদের স্কুলে ফেরার দিনেই যখন সাইরেন, বিস্ফোরণ ও আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গভীর—তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।


বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষা, মানসিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি প্রজন্ম স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।


বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে বেসামরিক জনগণ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধ বন্ধের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর