নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে মৃত হাজার ছাড়াল, নিখোঁজ প্রায় ৪ হাজার, চলছে উদ্ধার অভিযান

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ প্রায় চার হাজার। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা শত শত শ্রমিককে উদ্ধারে চলছে মরিয়া অভিযান।

নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে মৃত হাজার ছাড়াল, নিখোঁজ প্রায় ৪ হাজার, চলছে উদ্ধার অভিযান

নেপালে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধসে মৃত হাজার ছাড়াল, নিখোঁজ প্রায় ৪ হাজার, চলছে উদ্ধার অভিযান


নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট প্রবল পানির স্রোত, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে দেশের বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও প্রায় চার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজও চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সর্বশেষ প্রতিবেদনে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৩ জনে পৌঁছেছে এবং ৩ হাজার ৯১৬ জন এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা কিছুটা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধার ও শনাক্তকরণ কার্যক্রম চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি পাহাড়ি নদী ও উপত্যকার দিকে নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি ভয়াবহ স্রোতে পরিণত হয়ে আশপাশের বসতি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

বিশেষ করে নেপালের রাসুওয়া ও নুয়াকোট জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশুলি ও ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। অনেক এলাকায় বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর জমে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিপর্যয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের নিখোঁজ হওয়া। নেপালের অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় ৯০০ শ্রমিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নিখোঁজ শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে থাকতে পারেন।

বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়ায় অনেক জায়গায় প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উদ্ধারকারীদের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের মুখ পরিষ্কার করতে হচ্ছে। কিছু শ্রমিক দুর্যোগের সময় সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন বলে জানা গেছে। পরে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক সুড়ঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ এত ঘনভাবে জমেছে যে ভেতরে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা ড্রোন, খননযন্ত্র ও অন্যান্য অনুসন্ধানী সরঞ্জাম ব্যবহার করে জীবিত মানুষের সন্ধান করছেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, আটকে থাকা শ্রমিকদের নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়ছে।

ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও উদ্ধারকারীরা হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞ দলও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের কাছে পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।

বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাব নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অঞ্চলেও পড়েছে। সেখানে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক। সীমান্তবর্তী সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চীনের উদ্ধার অভিযানও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বন্যার পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাটি, পাথর, ভবনের অংশ ও অন্যান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত সামগ্রী। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি বরফ ও পাথরের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের হিমবাহজনিত বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

প্রায় এক সপ্তাহ পরও নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্তকরণ এবং দুর্গত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর