বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ছে, তবে দখলের ভাইরাল দাবির পক্ষে নেই নির্ভরযোগ্য প্রমাণ
ভেনেজুয়েলার তেল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে নানা দাবি, তবে বিশ্ব দখলের গোপন পরিকল্পনার প্রমাণ মেলেনি এখনো।
বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ছে, তবে দখলের ভাইরাল দাবির পক্ষে নেই নির্ভরযোগ্য প্রমাণ
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দীর্ঘ লেখায় দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো পরিকল্পিতভাবে একের পর এক দেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ওই লেখায় রাশিয়া, ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, কানাডা, ইরান, বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। তবে তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, এসব দাবির মধ্যে কিছু বাস্তব ঘটনার ভিত্তি থাকলেও অনেক বক্তব্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো ভেনেজুয়েলার তেল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে বড় ধরনের একটি তেল-সংক্রান্ত চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থার আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তেলক্ষেত্রে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুদের কথা বলা হয়েছে।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ উদ্যোগে সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনর্গঠনে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে বলে মার্কিন ও ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত “ভেনেজুয়েলার ৯০ শতাংশ তেল যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে”—এই দাবি সঠিক নয়।
ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুদের পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। সে হিসাবে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল মোট মজুদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরো ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাচ্ছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
কিউবাকে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে। ওয়াশিংটন কিউবার সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে।
তবে কিউবা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে যাবে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি ঘোষণা বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এ ধরনের দাবিকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা যায় না।
কানাডার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে বিরোধও তৈরি হয়েছে।
তবে কানাডার ভূখণ্ড বা প্রাকৃতিক সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত চুক্তির প্রমাণ নেই। কানাডার সরকারও দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
ভাইরাল লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় বিনা মূল্যে কিনে নিয়েছে এবং দেশের বন্দর, কৃষি, পোশাক, ওষুধ, তেল-গ্যাস ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও জ্বালানি সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও গভীর হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিও বাড়াচ্ছে।
এসব চুক্তির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা নয়।
বিশেষ করে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব ছড়িয়েছে। দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বা সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরি হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রকাশ্যে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
ভাইরাল লেখাটিতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ঘটনাকে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে সিরাজউদ্দৌলা, মুহাম্মদ ইউনূসকে রবার্ট ক্লাইভ এবং সেনাপ্রধানকে মীরজাফরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
তবে এগুলো ঐতিহাসিক তথ্য নয়; এগুলো লেখকের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও উপমা। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা করতে হলে আলাদা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন।
রাশিয়া ও ইউক্রেন নিয়েও একই ধরনের দাবি করা হয়েছে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়াকে দুর্বল করছে এবং ভবিষ্যতে পুতিনের মৃত্যুর পর পশ্চিমা কোনো অনুগত ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসানো হতে পারে।