বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তির অনন্য সাফল্যের গল্প

বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তি! নেপথ্যে থেকেও তাঁর সাউন্ডের জাদু পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে, গর্বিত করছে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন ও সংস্কৃতিকে।

বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তির অনন্য সাফল্যের গল্প

বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তির অনন্য সাফল্যের গল্প


মঞ্চে শিল্পী গান শুরু করলেই দর্শকের মনোযোগ চলে যায় তাঁর দিকে। কিন্তু শিল্পীর কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্রের সুর এবং পুরো পরিবেশনার শব্দ কতটা পরিষ্কার ও সুন্দরভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছাবে, তার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে একজন শব্দ প্রকৌশলীর। মঞ্চের আড়ালে থেকে যাঁরা এই কাজটি করেন, তাঁদের অনেক সময় দর্শক দেখতেও পান না। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এমনই একজন নেপথ্যের কারিগর আরাফাত কীর্তি। বাংলাদেশে সংগীতের শব্দ নিয়ে কাজ শুরু করে তাঁর পেশাগত পথচলা এখন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মঞ্চ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

আরাফাত কীর্তির সংগীত নিয়ে কাজের শুরু মূলত স্টুডিওকে কেন্দ্র করে। সংগীত প্রযোজনা, শব্দ মিশ্রণ ও চূড়ান্ত শব্দ সংযোজনের কাজ করতে গিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সংগীতের শব্দকে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য ছিল শিল্পীর কণ্ঠের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, বাদ্যযন্ত্রের নিজস্ব শব্দ এবং গানের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখে শ্রুতিমধুর ও আধুনিক শব্দ তৈরি করা।

স্টুডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর মঞ্চের কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্টুডিওতে একটি গান নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বারবার কাজ করার সুযোগ থাকে। কোনো শব্দ কমানো বা বাড়ানো, কণ্ঠের ভারসাম্য ঠিক করা কিংবা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ পরিবর্তন করার জন্য সময় পাওয়া যায়। কিন্তু সরাসরি মঞ্চে সেই সুযোগ থাকে না। শিল্পী গান শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই শব্দ প্রকৌশলীকে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

একটি বড় সংগীত অনুষ্ঠানে একই সময়ে শিল্পীর কণ্ঠের সঙ্গে তবলা, হারমোনিয়াম, গিটার, ঢোল, ড্রাম এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের শব্দ একসঙ্গে মিশে যায়। প্রত্যেকটি বাদ্যযন্ত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও পুরো পরিবেশনার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হয়। এই কাজের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকলেই হয় না, সংগীতের সুর, তাল, ছন্দ এবং আবেগও বুঝতে হয়। আরাফাত কীর্তির দীর্ঘদিনের স্টুডিও অভিজ্ঞতা তাঁকে এই জায়গায় বিশেষভাবে সাহায্য করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আরও কিছু বিশেষ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলা গান, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, গজল কিংবা কণ্ঠনির্ভর পরিবেশনায় শিল্পীর কণ্ঠ এবং বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ্ম শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় মঞ্চের শক্তিশালী শব্দব্যবস্থার মধ্যে সেই স্বাভাবিকতা ও আবেগ ধরে রাখা সব সময় সহজ হয় না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সংগীতের স্বাভাবিক উষ্ণতা এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন আরাফাত কীর্তি।

সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অবশ্য শুধু পেশাগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার থেকেই সংগীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। তাঁর ভাই আরাফাত মহসীনও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। দুই ভাই দীর্ঘ সময় ধরে সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তাঁদের পারিবারিক পরিবেশেও সংগীতের চর্চা ছিল। ছোটবেলা থেকেই সুর ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার পথটি তাঁদের জন্য আরও সহজ হয়েছে।

আরাফাত কীর্তি ২০০৯ সালে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। পরে দেশে ফিরে সংগীত ও শব্দ নিয়ে কাজ আরও বিস্তৃত করেন। বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর আবার যুক্তরাজ্যের সংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে তাঁর পেশাগত যোগাযোগ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, কনসার্ট এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের শিল্পীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর কাজের উপস্থিতি দেখা গেছে। লন্ডনে বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলস ও চিরকুটের কনসার্টে তিনি শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি ভারতীয় বাংলা গানের শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য এবং ভজন ও গজলশিল্পী অনুপ জালোটার মতো দক্ষিণ এশিয়ার পরিচিত শিল্পীদের যুক্তরাজ্যের অনুষ্ঠানেও তিনি কাজ করেছেন।

বিভিন্ন ধরনের শিল্পী ও সংগীতধারার সঙ্গে কাজ করার কারণে তাঁর অভিজ্ঞতার পরিধিও বেড়েছে। একটি ব্যান্ডের কনসার্টে যেভাবে শব্দের পরিকল্পনা করতে হয়, কণ্ঠ ও অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রনির্ভর অনুষ্ঠানে একইভাবে কাজ করা যায় না। শিল্পীর ধরন, গানের ধরন, মঞ্চের আকার এবং অনুষ্ঠানের পরিবেশ অনুযায়ী শব্দের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়। এই পার্থক্য বুঝে প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা শব্দব্যবস্থা তৈরি করাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

২০২৬ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘দেশান্তর—সীমান্তের ওপারে’ নামের একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনেও আরাফাত কীর্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ওই অনুষ্ঠানে সংগীত, নাটক, নৃত্য ও চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল। অনুষ্ঠানের শব্দ প্রযোজনার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তাঁর কাজ শুধু সংগীতের কনসার্টে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনেও তাঁর দক্ষতার ব্যবহার হচ্ছে।

শব্দ প্রকৌশলের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় মঞ্চে শিল্পীর কণ্ঠ এবং বাদ্যযন্ত্র দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে উন্নত শব্দব্যবস্থা, মাইক্রোফোন, শব্দ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে আরাফাত কীর্তির কাছে প্রযুক্তিই মূল বিষয় নয়। প্রযুক্তিকে তিনি শিল্পীর ভাবনা এবং দর্শকের অনুভূতির মধ্যে একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন।

তাঁর কাজের দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দর্শক যেন শুধু জোরালো শব্দ না শোনেন; বরং শিল্পীর গানের আবেগও অনুভব করতে পারেন। একটি ভালো পরিবেশনায় শিল্পীর কণ্ঠ কতটা পরিষ্কার, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ কতটা স্বাভাবিক এবং পুরো সংগীত কতটা ভারসাম্যপূর্ণ—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। এই কারণেই শব্দ প্রকৌশলকে তিনি শুধু যন্ত্রপাতি পরিচালনার কাজ হিসেবে দেখেন না।

বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তির যাত্রা তাই এক দিনের কোনো সাফল্যের গল্প নয়। দীর্ঘদিনের কাজ, সংগীতের প্রতি আগ্রহ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং মঞ্চের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর কাজের পরিধি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

আরাফাত কীর্তির গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি এমন একটি পেশায় কাজ করছেন যেখানে সফলতার বড় অংশই নেপথ্যে থাকে। শিল্পী মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের করতালি পান, কিন্তু সেই পরিবেশনার শব্দকে সঠিকভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে শব্দ প্রকৌশলীকে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে অত্যন্ত মনোযোগী থাকতে হয়। একটি ছোট ভুলও পুরো পরিবেশনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের দক্ষ পেশাজীবীদের প্রয়োজনও বাড়ছে। আরাফাত কীর্তির মতো বাংলাদেশি শব্দ প্রকৌশলীরা সেই জায়গায় কাজ করে শুধু নিজের পেশাগত পরিচয়ই তৈরি করছেন না, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সংগীতসংশ্লিষ্ট দক্ষতারও পরিচয় তুলে ধরছেন।

বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে শুরু হয়ে যুক্তরাজ্যের মঞ্চ পর্যন্ত আরাফাত কীর্তির পথচলা মূলত একটি নেপথ্যের সাফল্যের গল্প। মঞ্চে হয়তো তাঁকে দর্শক দেখতে পান না, তাঁর নামও সব সময় ঘোষণা করা হয় না। কিন্তু শিল্পীর কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্রের সুর যখন নিখুঁতভাবে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন সেই শব্দের পেছনে আরাফাত কীর্তির মতো নেপথ্যের কারিগরদের পরিশ্রম ও দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকে।