সাবেক সঙ্গীর হাতে অপহৃত নার্সকে পাঁচ দিন পর শিকলবন্দি অবস্থায় উদ্ধার

সাবেক সঙ্গীর হাতে অপহৃত নার্সকে পাঁচ দিন পর শিকলবন্দি অবস্থায় উদ্ধার, ভয়াবহ ঘটনায় তদন্তে নেমেছে ব্রাজিলের পুলিশ।

সাবেক সঙ্গীর হাতে অপহৃত নার্সকে পাঁচ দিন পর শিকলবন্দি অবস্থায় উদ্ধার

সাবেক সঙ্গীর হাতে অপহৃত নার্সকে পাঁচ দিন পর শিকলবন্দি অবস্থায় উদ্ধার


ব্রাজিলের গোয়েস অঙ্গরাজ্যে নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর ২৪ বছর বয়সী এক নার্সিং টেকনিশিয়ানকে একটি বাড়ি থেকে শিকল ও দড়ি দিয়ে আটকে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। এমিলিয়ানে তামারা নুনেস কারভালহো নামের ওই নারীকে আড়াগুয়াস লিনদাস দে গোইয়াস শহরের একটি বাড়ির ভেতর বিছানার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় তার সাবেক সঙ্গী আইলতন রদ্রিগেস দে সুজা গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে অপহরণ ও বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।

এমিলিয়ানে গত ১৭ আগস্ট নিখোঁজ হন। পরিবারের পক্ষ থেকে তার নিখোঁজের খবর পুলিশকে জানানোর পর শুরু হয় ব্যাপক অনুসন্ধান। তদন্তের সময় পুলিশ জানতে পারে, তার সাবেক সঙ্গীও ওই সময় থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে পুলিশের নজর তার গতিবিধির দিকে যায় এবং তাকে আটক করার পর তদন্তকারীরা এমন একটি বাড়ির সন্ধান পান, যেখানে এমিলিয়ানে বন্দি ছিলেন।

২১ আগস্ট পুলিশ ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির একটি কক্ষে এমিলিয়ানেকে হাত-পা ও গলায় বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে বিছানার সঙ্গে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল এবং মুখ বন্ধ রাখার জন্য বাঁধন ও একটি বিশেষ মাস্ক ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পুলিশ ঘরে প্রবেশের সময় তার চিৎকার শুনতে পায় এবং পরে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে।

উদ্ধারের সময় এমিলিয়ানে প্রচণ্ড আতঙ্কিত অবস্থায় ছিলেন এবং শারীরিক নির্যাতনের চিহ্নও দেখা যায়। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসা শেষে তিনি বাড়ি ফিরেছেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তার মুখ, চোখ, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন এবং শারীরিক দুর্বলতা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমিলিয়ানে নিজেই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে অভিযোগ করেন, তাকে জোর করে ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল এবং বন্দি অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তার দাবি, তার মুখে ক্ষত তৈরি হয়েছিল এবং কোনো এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের কারণে মুখের ভেতর ও ঠোঁটে পোড়ার মতো আঘাত হয়। এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তের অংশ এবং কর্তৃপক্ষ সেগুলো যাচাই করছে।

পুলিশের তদন্তে ওই বাড়িতে বেশ কিছু সন্দেহজনক সামগ্রী পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল হাতকড়া, দড়ি, বাঁধার সরঞ্জাম, ওষুধ, খাবার, পানি এবং একটি তালা। এসব আলামত দেখে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, ওই বাড়িটি শুধু স্বল্প সময়ের জন্য নয়, বরং এমিলিয়ানেকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়ে থাকতে পারে।

তদন্তকারীদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। পুলিশের দাবি, সন্দেহভাজন ব্যক্তি এমিলিয়ানেকে ওষুধ খাইয়ে অচেতন বা দুর্বল করে ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে শান্ত রাখার জন্য ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব তথ্যের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হবে।

এমিলিয়ানে জানিয়েছেন, তার সঙ্গে সাবেক সঙ্গীর প্রায় ছয় বছরের সম্পর্ক ছিল এবং গত বছরের ডিসেম্বরের দিকে তাদের বিচ্ছেদ হয়। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও ওই ব্যক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতেন এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাতেন। তিনি দাবি করেছেন, অতীতেও তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এমিলিয়ানের আরও অভিযোগ, সাবেক সঙ্গী আগে তার গাড়ির চাকার সঙ্গে কারসাজি করেছিলেন, যাতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরও কিছু ভয়ভীতি ও হয়রানির ঘটনার কথা জানিয়েছেন। এসব অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আগেও একাধিক অভিযোগ বা পুলিশি নথি থাকার কথা উঠে এসেছে।

ঘটনার সঙ্গে একটি চিঠিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছে এমন একটি চিঠি পেয়েছে, যা এমিলিয়ানের নামে লেখা ছিল এবং তার মায়ের উদ্দেশে দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে পুলিশকে না ডাকতে বলা হয়েছিল এবং তার সম্পত্তি ও অর্থসংক্রান্ত কিছু নির্দেশনা ছিল। তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন, চিঠিটি তাকে জোর করে বা ভয় দেখিয়ে লিখিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে চিঠিটির প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

সন্দেহভাজন আইলতন রদ্রিগেসকে ২১ আগস্ট পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ কিছু সামগ্রী উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরে আদালতে শুনানির পর তার প্রাথমিক গ্রেপ্তারকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মামলায় অপহরণ, বেআইনিভাবে আটকে রাখা এবং অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, তবে সেটিকে বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে; তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টির চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে।

অভিযুক্তের পক্ষের আইনজীবী অবশ্য মামলাটি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের আনুষ্ঠানিক নথি ও প্রমাণ পুরোপুরি পর্যালোচনা না করে বিভিন্ন বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। ফলে মামলাটির অভিযোগগুলো এখনো বিচারাধীন এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি।

উদ্ধারের পর এমিলিয়ানে অন্য নারীদের উদ্দেশেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সম্পর্কের শুরুতেই যদি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, ভয় দেখানো, হুমকি বা সহিংসতার লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নারীদের এমন সম্পর্ক থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই ঘটনা ব্রাজিলে নারী নির্যাতন ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে সহিংসতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে একজন সাবেক সঙ্গীর হাতে একজন নারী কীভাবে কয়েক দিন ধরে একটি বাড়িতে বন্দি ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে জীবিত উদ্ধার করেছে ঘটনাটি দেশটির সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন পুরো ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, বাড়িটি কী উদ্দেশ্যে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল এবং এমিলিয়ানেকে ঠিক কীভাবে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগগুলোরও প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলার সব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর