হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের নতুন আহ্বান, তেলের বাজারে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
সাত দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি চাইছে ইরান। হরমুজ প্রণালির উত্তেজনায় ব্রেন্ট তেলের দাম একপর্যায়ে ১১২ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে ইরান সাত দিনের একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও আহ্বান জানিয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে অবরোধ, তেল রপ্তানি এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামকে উচ্চ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে তেহরানের সাত দিনের পরিকল্পনা এখনো আলোচনার জন্য রয়েছে। ইরানের প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা কমানো। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত মেনে নিতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টি। পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে সামরিক সংঘাত বন্ধের দাবিও রয়েছে। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে সমঝোতা হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করার পথ তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবের সব শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং ইরান আবারও প্রস্তাবটি গ্রহণের আহ্বান জানানোয় কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে রাখার চাপ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব এখনো স্পষ্ট।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যে এর ভূমিকা বিবেচনা করতে হবে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান সংকটে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান ভিন্ন। ইরান বলছে, নৌপথ স্বাভাবিক করার সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোর সমাধানও যুক্ত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই মতপার্থক্য দূর না হলে কূটনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও। রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১১১ দশমিক ৯৯ ডলারে উঠেছিল। পরে দাম কমে ১০৮ দশমিক ৭২ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ, বাজারে দাম ওঠানামা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। এই দাম নির্দিষ্ট সময়ের বাজারচিত্র; একে সারাদিনের স্থির মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
তেলের দাম বেশি থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে পরিবহন, পণ্য উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার খরচও বেড়ে যেতে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের কিছু অংশ পণ্যের দামে যোগ করলে সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে তেলের দাম শুধু যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; উৎপাদন, বৈশ্বিক চাহিদা, মজুত এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর নীতিও এতে প্রভাব ফেলে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা না হলে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিপরীতে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সংঘাত কমানোর বিষয়ে অগ্রগতি হলে বাজারের উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। তবে শুধু প্রস্তাব দেওয়াকে বাস্তব সমঝোতা হিসেবে দেখা যাবে না। প্রস্তাবের শর্ত, উভয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং বাস্তবে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আহ্বান মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। তবে ট্রাম্পের আগের প্রত্যাখ্যানের পর এখনো দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং তেলের বাজারের গতিপথ নির্ভর করবে পরবর্তী কূটনৈতিক যোগাযোগ, সামরিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সরবরাহে বাস্তব পরিবর্তনের ওপর।





