ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের পথে, শিগগিরই সই হতে পারে,জানালেন রুবিও
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। মুম্বাইয়ে মার্কো রুবিও জানালেন, কয়েকটি বিষয় নিষ্পত্তি হলেই চুক্তি সইয়ের পথ খুলতে পারে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্য আলোচনা নতুন করে গতি পেয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। মুম্বাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, চুক্তির বিষয়ে অল্প কয়েকটি বিষয় এখনো নিষ্পত্তি করা বাকি রয়েছে। সেগুলোর সমাধান হলে শিগগিরই চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং স্বাক্ষরের বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হয়নি।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও শুল্কনীতি, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়টি আলোচনায় বাধা তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাণিজ্যের শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। রুবিওর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অচলাবস্থা কাটিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা তৈরি হয়েছে। তবে কোন কোন বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা পরিচালনা না করলেও রুবিও বলেছেন, তিনি এবং তাঁর ভারতীয় প্রতিপক্ষ এই চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছেন। ভারতের বাণিজ্য কর্মকর্তারাও এর আগে জানিয়েছিলেন, চুক্তির প্রথম পর্যায়ের খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে এবং আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক বক্তব্য দুই দেশের আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত ও বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনো স্পষ্ট নয়।
এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে শুল্কের বিষয়টি। ২০২৫ সালে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত একটি কাঠামোগত সমঝোতায় নির্দিষ্ট ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্কের হার ১৮ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলা হয়। তবে এই কাঠামোকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে দেখা যাবে না। দুই দেশকে এখনো চূড়ান্ত শর্ত, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বাস্তবায়নের বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। পোশাক, ওষুধ, প্রকৌশল পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসায় শুল্কের হার বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত চায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তার রপ্তানিকারকেরা প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পান এবং ভবিষ্যতে শুল্কনীতিতে অনিশ্চয়তা কমে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের বাজারে নিজেদের পণ্য ও পরিষেবার প্রবেশাধিকার বাড়াতে আগ্রহী। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ বাণিজ্য পরিকল্পনা আরও স্পষ্টভাবে করতে পারবেন।
বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানিও দুই দেশের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনেছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক শুল্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য কিছু শুল্কের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছেন। এতে বাণিজ্য আলোচনার পথে একটি বাধা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারপরও জ্বালানি আমদানি ও শুল্কনীতি নিয়ে দুই দেশের অবস্থান ভবিষ্যৎ সমঝোতায় গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
মুম্বাইয়ের বৈঠকে বাণিজ্যের পাশাপাশি জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রুবিও এবং জয়শঙ্কর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও অংশ নেন। সেখানে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অভিন্ন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। এই যোগাযোগ দেখায়, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কৌশলগত সহযোগিতাও দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চুক্তি চূড়ান্ত হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্ক ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আরও স্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও ভারতের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে। তবে প্রকৃত সুবিধা নির্ভর করবে চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত, পণ্যভিত্তিক শুল্ক, বাজারে প্রবেশের নিয়ম এবং বাস্তবায়নের সময়সূচির ওপর। কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য সংবেদনশীল খাতের স্বার্থ রক্ষা করাও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
মার্কো রুবিওর বক্তব্য ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। কয়েকটি বিষয় নিষ্পত্তি হলে চুক্তি সইয়ের পথ এগোতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের আলোচনার ফলই নির্ধারণ করবে, দীর্ঘদিনের এই বাণিজ্য সমঝোতা কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয়।





