বাড়িভাড়া-মজুরির চাপে ফুঁসছে ইউরোপ, চার দেশে তীব্র বিক্ষোভ
জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া ও কম মজুরির চাপে ইউরোপের চার দেশে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তার; সরকারের ওপর বাড়ছে জনঅসন্তোষের চাপ।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, আবাসনব্যয়, কম মজুরি এবং শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। আন্দোলনগুলো একই সংগঠনের অধীনে পরিচালিত না হলেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে মিল রয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেন পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকসংকট এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে শুরু হওয়া অসন্তোষ পরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিবাদেও বিস্তৃত হয়।
প্যারিসসহ একাধিক শহরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে ভাঙচুর, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি সরকারি ভবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার খবর পাওয়া যায়। ফরাসি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১৫০ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। পরবর্তী হালনাগাদে ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানান, সপ্তাহান্তের সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় ২ হাজার ৫১৩ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, পরবর্তী হিসাবটি আগের সংখ্যার চেয়ে বেশি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছেন। তবে বিক্ষোভের পেছনে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও জনসেবাসংক্রান্ত অসন্তোষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধবিরোধী দাবিতে শুরু হওয়া মিছিলের একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন, ব্যারিকেডে আগুন দেন এবং বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে, কিন্তু শহরে আগুন জ্বালানো গ্রহণযোগ্য নয়। মিলানের মেয়র জিউসেপ্পে সালাও বিক্ষোভের পেছনের মানুষের অসন্তোষকে বোধগম্য বলে উল্লেখ করলেও সহিংসতা ও নগরীর সম্পদের ক্ষতিকে সমর্থন করেননি।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষা খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ এবং শিক্ষাসংক্রান্ত নীতির পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ ছিল আন্দোলনের অন্যতম কারণ। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদও চলছিল।
বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। ব্রাসেলসের বাইরেও লিয়েজ শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে হাজারো মানুষ উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, কম মজুরি এবং সাশ্রয়ী বাসস্থানের অভাবের প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বড় শহরগুলোতে বাড়ি কেনা বা ভাড়া নিয়ে বসবাস করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে বাড়িভাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লিসবনের কেন্দ্রীয় রসিও চত্বরে বিক্ষোভকারীদের একাংশ তাঁবু স্থাপন করে আবাসনসংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাস্তায় বিক্ষোভের চাপে সরকার নীতি পরিবর্তন করবে না।
আল-জাজিরার ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালের মূল্যবৃদ্ধি, মজুরি এবং আবাসন ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুসারে, ২০০০ সালের তুলনায় দৈনন্দিন পণ্য ও পরিষেবার দাম ফ্রান্সে ৫৯ শতাংশ, ইতালিতে ৬৮ শতাংশ, পর্তুগালে ৭১ শতাংশ এবং স্পেনে ৭৮ শতাংশ বেড়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই দেশগুলোতে দাম ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। মজুরি একই গতিতে না বাড়ায় অনেক পরিবার এখনো আর্থিক চাপ অনুভব করছে। বাড়ির দাম ও আয়ের ব্যবধান বৃদ্ধির কারণে তরুণদের জন্য নিজস্ব বাসস্থানের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউরোপীয় নীতি ও আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলবার্তো আলেমান্নো আল-জাজিরাকে বলেছেন, ফ্রান্সের আন্দোলন ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব বিক্ষোভকে একটি অভিন্ন আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; দেশভেদে দাবিদাওয়া ও পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে।





