গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার
মৃত্যুদণ্ডের রায় ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেও ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। তবে তাঁর ছেলে জানিয়েছেন, ফেরার তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে আবারও দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন থেকে আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, এমনকি প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও তিনি দেশে ফিরতে চান বলে জানান।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ও এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবারের ওই ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, দেশের মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে চান না। তবে দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা করেননি।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ফেরার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। সময় ঘনিয়ে এলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হতে পারে। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ঘোষণা থাকলেও তাঁর প্রত্যাবর্তনের বাস্তব সময়সূচি এখনো অনিশ্চিত।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রতিবেদনে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট দমন-পীড়নের ঘটনায় ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি আইনি ও অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আইনি সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে তিনি ঠিক কবে ফিরবেন এবং ফেরার আগে কোনো আইনি বা কূটনৈতিক সমঝোতা হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
শেখ হাসিনা শুধু নিজের প্রত্যাবর্তনের কথাই বলেননি; আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বিচারসংক্রান্ত পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। শেখ হাসিনার বক্তব্য তাঁর দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে, যদিও তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ার কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।
শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ঢাকা ও নয়াদিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছে, আর ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি পর্যালোচনাধীন। ফলে তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা দুই দেশের কূটনৈতিক ও আইনি যোগাযোগের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
এর আগে ২০২৬ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা দিল্লিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অডিও বার্তার মাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সে সময়ও তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহালের দাবি জানান। নতুন বক্তব্যে তিনি আবারও ফেরার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।





