রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার নিশ্চিতে বাংলাদেশের পাশে ওআইসি, আন্তর্জাতিক আদালতে জোরালো সমর্থন
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ওআইসির সদস্যদেশগুলো। বাগদাদের বৈঠকে বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগ, মানবিক সহায়তা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান মামলার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্যদেশগুলো। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অনুষ্ঠিত ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম অধিবেশনের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিয়ে আয়োজিত মন্ত্রী পর্যায়ের বিশেষ কমিটির বৈঠকে এই অঙ্গীকার করা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতা ও বিশেষ কমিটির সহসভাপতি হিসেবে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ওআইসির সদস্যদেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে এবং সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট সমাধানে শুধু বক্তব্য বা কূটনৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ।
বৈঠকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে চলমান মামলার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত কথিত গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে গাম্বিয়ার করা মামলাটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারাধীন। এই মামলার মাধ্যমে গণহত্যা সনদ অনুযায়ী মিয়ানমারের দায় নির্ধারণের প্রশ্ন বিবেচিত হচ্ছে। ওআইসির সদস্যদেশগুলোর সমর্থন মামলাটির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও কূটনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী উপস্থাপিত পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক কাঠামোর মাধ্যমে ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে থেকেই বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি বড় জনগোষ্ঠী বসবাস করছিল। ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান হলো, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে। এ জন্য মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার এবং নাগরিকত্বসহ নিজেদের অধিকার নিয়ে নিশ্চিন্তে ফিরতে পারেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে, তবে প্রত্যাবাসন ও সংকটের সামগ্রিক সমাধানের জন্য কূটনৈতিক আলোচনা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।
বাগদাদের বৈঠকে ওআইসির সদস্যদেশগুলোর সমর্থন রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন করে গুরুত্ব বহন করছে। তবে এই সমর্থন নিজে থেকে মামলার চূড়ান্ত রায় বা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দেয় না। সংকটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, মিয়ানমারের দায়বদ্ধতা, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরার বাস্তব পরিস্থিতি তৈরির ওপর।





