নিউইয়র্কে ১০ হাজারের বেশি শিশুর বিনামূল্যে শিশুযত্ন, অপেক্ষমাণ পরিবারগুলো পেল বড় সুখবর
নিউইয়র্ক সিটিতে ১০ হাজারের বেশি নিম্নআয়ের শিশু বিনামূল্যে শিশুযত্নের সুযোগ পেতে যাচ্ছে, অভিবাসী ও কর্মজীবী পরিবারেও স্বস্তি ফিরছে।
নিউইয়র্কে ১০ হাজারের বেশি শিশুর বিনামূল্যে শিশুযত্ন, অপেক্ষমাণ পরিবারগুলো পেল বড় সুখবর
নিউইয়র্ক সিটিতে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিনামূল্যে শিশুযত্নের সুযোগ আরও বড় হচ্ছে। মেয়র জোহরান মামদানির প্রশাসন ঘোষণা করেছে, শহরের শিশুযত্ন সহায়তা কর্মসূচির অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ১০ হাজারের বেশি শিশুকে ধাপে ধাপে বের করে এনে ভর্তুকিযুক্ত শিশুযত্নের সুযোগ দেওয়া হবে।
এই ঘোষণা নিউইয়র্কের কর্মজীবী পরিবারগুলোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুর যত্নের খরচ শহরটির পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে বড় আর্থিক চাপ। অনেক বাবা-মা সন্তানের যত্নের ব্যয় বহন করতে গিয়ে কাজের সময় কমাতে বাধ্য হন, কেউ কেউ চাকরি বা পড়াশোনাও বাদ দেন। নতুন এই উদ্যোগ সেই চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করছে।
নিউইয়র্ক সিটির শিশুযত্ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ৬ সপ্তাহ বয়স থেকে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত যোগ্য শিশুরা সহায়তা পেতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ১৯ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ এটি শুধু ছোট শিশুদের জন্য নয়, বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন বড় শিশুদের পরিবারও এর আওতায় আসতে পারে।
তবে ১০ হাজারের বেশি শিশুকে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে সরানো হলেও সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুবিধা পাবে না। শহর কর্তৃপক্ষ আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করবে। এরপর পরিবারগুলোকে আবেদন করতে হবে এবং নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। যোগ্য হলে তারা নিজেদের পছন্দের অংশগ্রহণকারী শিশুযত্নকেন্দ্র বা সেবাদাতার কাছে ভাউচার ব্যবহার করতে পারবেন।
এই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অপেক্ষমাণ তালিকাটি অনেক বড়। শহরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯ হাজার শিশু এই সহায়তার অপেক্ষায় ছিল। এর অর্থ হলো ১০ হাজারের বেশি শিশুকে সুযোগ দেওয়ার পরও প্রায় ২০ হাজার শিশু সহায়তার অপেক্ষায় থাকতে পারে। তাই নতুন ঘোষণা বড় অগ্রগতি হলেও পুরো সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি।
শিশুযত্ন ভাউচারের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে চাহিদা ও অর্থের বড় ব্যবধান। ২০২৫ সালের মে মাসে নতুন পরিবারগুলোকে অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা শুরু হয়, কারণ সহায়তার প্রয়োজন থাকা শিশুর সংখ্যা কর্মসূচির বিদ্যমান সক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে গিয়েছিল। এরপর অপেক্ষমাণ পরিবারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
এবারের সম্প্রসারণে নিউইয়র্ক রাজ্য সরকারের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গভর্নর ক্যাথি হোকুল নিউইয়র্ক সিটির বিনামূল্যে শিশুযত্ন উদ্যোগে মোট ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৭৫ মিলিয়ন ডলার বিশেষভাবে শিশুযত্ন ভাউচার কর্মসূচি স্থিতিশীল ও সম্প্রসারণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
এর আগে আগস্টে মেয়র মামদানি প্রশাসন ভাউচার বা চুক্তিভিত্তিক সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর নিজেদের পকেট থেকে দেওয়া শিশুযত্নের খরচও তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই উদ্যোগে প্রায় ২২ হাজার নিম্নআয়ের পরিবার উপকৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। শহরটি ওই পরিবারের বার্ষিক প্রায় ৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের নিজস্ব খরচ বহনের পরিকল্পনা করে।
নিউইয়র্ক সিটির শিশুযত্ন নীতির সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থারও একটি বড় সম্পর্ক রয়েছে। শহরটি দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যের ২-কে কর্মসূচি শুরু করেছে। ২০২৬ সালে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার শিশুকে আসন দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আগামী বছর এই কর্মসূচিতে আরও প্রায় ১০ হাজার আসন যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিশুযত্নের খরচ কমানোকে নিউইয়র্কের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে মেয়র প্রশাসন। বিশেষ করে তরুণ পরিবারগুলো শহর ছাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বাড়িভাড়া ও শিশুযত্নের উচ্চ ব্যয়কে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে বিনামূল্যে বা ভর্তুকিযুক্ত শিশুযত্ন শুধু শিশুদের সুবিধা নয়, কর্মজীবী বাবা-মায়ের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এই উদ্যোগ অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নিউইয়র্কে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও অভিবাসী পরিবার বসবাস করে, যাদের অনেকেই উচ্চ শিশুযত্ন ব্যয়ের কারণে কাজ ও পরিবারের দায়িত্বের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। শহর কর্তৃপক্ষ এবার শিশুযত্নকেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে।
শহরের নতুন শিশুযত্ন মানচিত্রে এখন কোন কোন লাইসেন্সপ্রাপ্ত কেন্দ্র ভাউচার গ্রহণ করে, সেটিও দেখা যাবে। এর ফলে পরিবারগুলোকে একের পর এক কেন্দ্রের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ভাউচার গ্রহণ করে কি না জানতে হবে না। অনলাইনে তথ্য দেখে নিজেদের জন্য উপযুক্ত কেন্দ্র খুঁজে নেওয়া সহজ হবে।
তবে এই উদ্যোগের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শুধু শিশুদের ভাউচার দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশুযত্নকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং স্থিতিশীল অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ নতুন ভাউচার পাওয়া পরিবারগুলো যদি পছন্দের এলাকায় পর্যাপ্ত আসন না পায়, তাহলে কাগজে সহায়তা থাকলেও বাস্তবে সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
শিশুযত্ন সেবাদাতাদের আর্থিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। শহরের কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কর্মীদের বেতন ও কেন্দ্র পরিচালনার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। নতুন বিনিয়োগের ফলে পরিবারগুলোর পাশাপাশি শিশুযত্নকেন্দ্রগুলোও স্থিতিশীল হলে পুরো ব্যবস্থাটি আরও কার্যকর হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিউইয়র্ক সিটি এখন ধীরে ধীরে সার্বজনীন শিশুযত্ন ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে। ১০ হাজারের বেশি শিশুকে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে বের করে আনার ঘোষণা সেই পরিকল্পনার একটি বড় ধাপ। তবে প্রায় ২০ হাজার শিশু এখনো অপেক্ষায় থাকতে পারে বলে এই উদ্যোগকে শেষ নয়, বরং বড় একটি শুরু হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিবারগুলোর কাছে আবেদন করার আমন্ত্রণ পাঠানো শুরু হবে এবং পরবর্তী কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে আবেদন নেওয়া হবে। তাই নিউইয়র্কে যেসব পরিবার শিশুযত্ন সহায়তার অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে, তাদের শহরের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও আবেদনের নির্দেশনার দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে বাড়িভাড়া, অন্যদিকে খাবার, পরিবহন ও শিশুযত্নের খরচ—সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে পরিবার পরিচালনা করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় ১০ হাজারের বেশি শিশুর জন্য নতুন করে বিনামূল্যে শিশুযত্নের সুযোগ তৈরি হওয়া কর্মজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বড় স্বস্তির খবর।
তবে অপেক্ষমাণ তালিকার বাকি পরিবারগুলোর জন্য আরও অর্থায়ন এবং আসন তৈরি করা এখন পরবর্তী বড় পরীক্ষা। নিউইয়র্ক সিটি যদি ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে পারে, তাহলে এটি শুধু শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগই বাড়াবে না, বরং বাবা-মায়ের কাজ, আয় এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।