সন্তান জন্মের কয়েকদিন পরই বড় আইনি লড়াই, নিউ জার্সির কংগ্রেস সদস্যের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
নবজাতক কন্যার জন্মের আনন্দের মধ্যেই ফেডারেল মামলার চাপে নিউ জার্সির কংগ্রেস সদস্য লামোনিকা ম্যাকআইভারের সামনে নতুন সিদ্ধান্ত।
সন্তান জন্মের কয়েকদিন পরই বড় আইনি লড়াই, নিউ জার্সির কংগ্রেস সদস্যের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
নিউ জার্সির কংগ্রেস সদস্য লামোনিকা ম্যাকআইভারের জন্য একই সময়ে আনন্দ ও কঠিন আইনি লড়াই সামনে এসেছে। মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে চলা ফেডারেল মামলায় তিনি পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না।
ম্যাকআইভার নিউ জার্সির দশম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি। ৪০ বছর বয়সী এই কংগ্রেস সদস্য ১ অক্টোবর দ্বিতীয় কন্যাসন্তানের জন্মের ঘোষণা দেন। তাঁর প্রথম সন্তানও একজন কন্যা, যার বয়স ১০ বছর। তিনি জানিয়েছেন, অক্টোবর মাসে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে সুস্থ হয়ে নভেম্বর মাসে কংগ্রেসের ভোটিং কার্যক্রমে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু মাতৃত্বের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে চলা ফেডারেল মামলা নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মামলাটি ২০২৫ সালের মে মাসে নিউ জার্সির নিউয়ার্কে ডেলানি হল নামের একটি অভিবাসন আটককেন্দ্রের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সেদিন ম্যাকআইভারসহ কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য ওই কেন্দ্রে কংগ্রেসের তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়েছিলেন। একই সময়ে সেখানে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। নিউয়ার্কের তৎকালীন মেয়র রাস বারাকাও সেখানে উপস্থিত হন।
ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, মেয়র বারাকাকে আটক করার চেষ্টা করার সময় ম্যাকআইভার ফেডারেল কর্মকর্তাদের বাধা দেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে শারীরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৫ সালের জুনে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ফেডারেল কর্মকর্তাদের আটক ও দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়েছিলেন।
ম্যাকআইভার অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর আইনজীবীরা বলেছেন, তিনি কংগ্রেসের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে আটককেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ঘটনাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ওপর কংগ্রেসের তদারকি করার কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কংগ্রেস সদস্য হিসেবে ম্যাকআইভার সংবিধানের বিশেষ সুরক্ষা বা স্পিচ অ্যান্ড ডিবেট ক্লজের আওতায় এই মামলায় দায়মুক্তি পাবেন কি না।
ফেডারেল আপিল আদালত আগস্টে তাঁর মামলা বাতিলের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। আদালত বলেছে, তাঁর বিরুদ্ধে যে ধরনের আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোকে কংগ্রেসের আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় সরাসরি ফেলা যায় না।
এখন ম্যাকআইভারের সামনে নতুন আইনি সিদ্ধান্তের সময়সীমা এসেছে। ৯ অক্টোবরের মধ্যে তিনি আপিল আদালতে পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে। চাইলে তিনি আরও উচ্চতর আইনি লড়াইয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পথও বিবেচনা করতে পারেন। অন্যথায় মামলাটি বিচারপর্বের দিকে এগোতে পারে।
এই মামলাটি নিউ জার্সির রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ ডেলানি হল আটককেন্দ্রটি নিউয়ার্ক এলাকায় অবস্থিত এবং অভিবাসন আটক ও কেন্দ্রটির পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে।
ম্যাকআইভার নিজেও ডেলানি হলের পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁর কার্যালয়ের প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি আটককেন্দ্রটির পরিস্থিতি এবং সেখানে আটক ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে ফেডারেল প্রসিকিউশন বলছে, কংগ্রেস সদস্য হলেও কোনো আইনপ্রণেতা ফেডারেল কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা বা শারীরিকভাবে আক্রমণ করার অভিযোগ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্তি পেতে পারেন না। এই আইনি প্রশ্নটি ভবিষ্যতে কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
মামলাটি আরও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে কারণ এটি সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রয়োগ নিয়ে ইতোমধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। একদিকে প্রশাসন বলছে, সীমান্ত ও অভিবাসন আইন কার্যকর করতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নেতারা আটককেন্দ্র, নির্বাসন এবং অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করছেন।
ম্যাকআইভারের ঘটনা তাই শুধু একজন কংগ্রেস সদস্যের ব্যক্তিগত আইনি সমস্যা নয়। এটি কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতা, ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তৃত্ব এবং অভিবাসন নীতির রাজনৈতিক সংঘাত এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
ম্যাকআইভার বর্তমানে পুনর্নির্বাচনের জন্যও প্রচারণা চালাচ্ছেন। ফলে মামলার আইনি ফলাফল তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি যদি মামলাটি চালিয়ে যান, তাহলে নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি তাঁকে দীর্ঘ আইনি লড়াই পরিচালনা করতে হবে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, নতুন সন্তান জন্মের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, মাতৃত্ব তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং অক্টোবর মাসে তিনি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে চান। একই সঙ্গে তিনি নভেম্বর থেকে কংগ্রেসের দায়িত্বে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন।
মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিনি এখনো দোষী সাব্যস্ত হননি এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
এখন ৯ অক্টোবরের আইনি সময়সীমার দিকে নজর রয়েছে। ম্যাকআইভার পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন, সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, নাকি মামলাটি বিচারপর্বে যেতে দেবেন—সেটিই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন।
এই ঘটনায় নিউ জার্সির অভিবাসী সম্প্রদায়ও বিশেষভাবে নজর রাখছে। কারণ ডেলানি হল ও অভিবাসন আটক নীতিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব নিউয়ার্কসহ পুরো নিউ জার্সির অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর পড়তে পারে।