ফখরুলের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনারের বৈঠক, বাণিজ্য ও সংস্কারে নতুন বার্তা ঢাকার জন্য
অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী, রোহিঙ্গা সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ফখরুলের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনারের বৈঠক, বাণিজ্য ও সংস্কারে নতুন বার্তা ঢাকার জন্য
ঢাকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইলের সৌজন্য সাক্ষাতে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশন বাংলাদেশ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠকের ছবি প্রকাশ করে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা, মানবাধিকার এবং বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে কথা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার দিকে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। অস্ট্রেলিয়া সরকারের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে। শিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নারী ক্ষমতায়নও অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
সাম্প্রতিক বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা নিয়েও দুই পক্ষের আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার এবং একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির জন্যও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
এর আগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হাইকমিশনারের আরেক বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অস্ট্রেলিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চিকিৎসা প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও উৎপাদন খাতে অস্ট্রেলীয় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। একই বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মীদের অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সুযোগ বাড়ানো, বৃত্তি ও শিক্ষা বিনিময় এবং কারিগরি প্রশিক্ষণে সহযোগিতার বিষয়ও উঠে আসে।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি বড় বিষয় রোহিঙ্গা সংকট। অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। নতুন বৈঠকেও অস্ট্রেলিয়া এই সহায়তা অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট এখনো বড় মানবিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ। কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার ধারাবাহিক সহায়তা এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
বৈঠকে মানবাধিকার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নজরে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসনের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংস্কারের অগ্রগতিও বৈঠকের আলোচনায় এসেছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক কাঠামোতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে দেশের ভেতরে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অংশীদাররাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের সম্পর্কও রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন। দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষ জনশক্তি বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন কারিগরি পেশায় দক্ষ বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবাজারে সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ চাইছে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও বেশি দক্ষ কর্মী তৈরি করে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে পাঠাতে।
এর আগে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিশেষ করে পরিচর্যা সেবা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশি তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জ্বালানি সহযোগিতাও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বাংলাদেশ তার জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনতে চাইছে। অস্ট্রেলিয়া প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্বালানি খাতে বড় একটি দেশ হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও বাড়ছে। নভেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সুসান রাইলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বৈঠককে শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকট, মানবাধিকার, সাংবিধানিক সংস্কার, দক্ষ জনশক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।