রেজাইয়ের কড়া জবাব, কল্পনায় প্রতিদিন জিতলেও ইরানই বাস্তবতা গড়ছে: ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ

ট্রাম্পের যুদ্ধজয়ের দাবিকে কল্পনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দিয়ে ইরানের শক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ও হরমুজ নিয়ন্ত্রণের কথা তুলে ধরলেন মোহসেন রেজাই আজ।

রেজাইয়ের কড়া জবাব, কল্পনায় প্রতিদিন জিতলেও ইরানই বাস্তবতা গড়ছে: ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ

রেজাইয়ের কড়া জবাব, কল্পনায় প্রতিদিন জিতলেও ইরানই বাস্তবতা গড়ছে: ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ


ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধজয়ের দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। ২ অক্টোবর দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট বলে আক্রমণ করেন এবং দাবি করেন, ট্রাম্পের যুদ্ধজয়ের বক্তব্য বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার কাছাকাছি। 

রেজাইয়ের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—যুদ্ধের ফলাফল বক্তৃতা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ চাইলে নিজের কল্পনায় প্রতিদিন যুদ্ধ জিততে পারে, কিন্তু বাস্তবতা তৈরি করে ইরানের জনগণ, সেনাবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বিজয় দাবির জবাব দিয়েছেন।

এর আগে ট্রাম্পও প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ইরান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার করবে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি খুব দ্রুত ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিংবা তার আগেই যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে জয়ী হতে পারে। তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কাছাকাছি থাকা একটি দেশ হিসেবেও তুলে ধরেছেন। 

এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পেছনে রয়েছে কয়েক মাস ধরে চলা দীর্ঘ সংঘাত। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সংঘাত বড় আকার নেয়। পরে যুদ্ধবিরতি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। 

রেজাইয়ের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ নিয়ে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতার কথা বলে আসছে। জুনে রেজাই হরমুজ প্রণালিকে ইরানের প্রতিরোধক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি তখন দাবি করেছিলেন, এই জলপথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে। 

সেপ্টেম্বরেও রেজাই দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ে সীমিতসংখ্যক জাহাজ প্রণালিটি ব্যবহার করছিল। তবে এসব দাবি মূলত ইরানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য; আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাই রেজাইয়ের বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বাস্তবসম্মত নয়। 

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক উপগ্রহভিত্তিক ও জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন আগের কয়েক মাসের তুলনায় বেড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ওই মাসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে একাধিক গ্যাসবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ ইরান জলপথে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেও সম্পূর্ণভাবে সব ধরনের বাণিজ্যিক চলাচল বন্ধ রয়েছে এমন দাবি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। 

তবে হরমুজকে কেন্দ্র করে ঝুঁকি যে বাস্তব, তা নিয়ে সন্দেহ কম। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বড় হামলা হলে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর পরিধি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘাঁটি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থাপনাতেও বিস্তৃত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

একই সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো শর্ত দিয়েছে। ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ফলে সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ একই সময়ে চলতে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। 

এই পরিস্থিতিতে রেজাইয়ের বক্তব্যকে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে তেহরান বোঝাতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সাফল্য দাবি করলেও ইরান এখনো প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কথা সামনে এনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত চাপ বজায় রাখার বার্তা দিয়েছেন।

তবে যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক সাফল্য তুলে ধরছে এবং প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যর্থতার দাবি করছে। স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো পক্ষের বিজয় দাবিকেই এককভাবে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

মোহসেন রেজাইয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য সত্যিই দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর বক্তব্যে ট্রাম্পের যুদ্ধজয়ের দাবির সরাসরি বিরোধিতা রয়েছে। কিন্তু ইরান যে যুদ্ধ জিতে গেছে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই জিততে পারবে না এমন সিদ্ধান্ত তাঁর বক্তব্য থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। বরং সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, দীর্ঘ সংঘাতের পাশাপাশি সামরিক চাপ, জ্বালানি পরিবহন ও কূটনৈতিক দরকষাকষি সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ এখনো অনিশ্চিত ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর