বাব আল-মান্দাব পুনর্দখলে সৌদি অভিযান, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলায় অনীহা, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

হুতিদের দখলে যাওয়া বাব আল-মান্দাব পুনর্দখলে সৌদি বাহিনী প্রস্তুত, তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নিতে রাজি নয়।

বাব আল-মান্দাব পুনর্দখলে সৌদি অভিযান, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলায় অনীহা, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা

বাব আল-মান্দাব পুনর্দখলে সৌদি অভিযান, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলায় অনীহা, বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা


সৌদি আরব ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সামরিক অভিযান প্রস্তুত করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী স্থল অভিযান চালাবে এবং তাদের সহায়তায় সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালাবে। তবে এই অভিযানে সরাসরি মার্কিন বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন প্রত্যাখ্যান করেছে। 

দাবিটির মূল অংশের সত্যতা পাওয়া গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সৌদি আরব ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল পুনর্দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে রয়টার্সও জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনায় ইয়েমেনি স্থলবাহিনীকে সামনে রেখে সৌদি বিমান হামলার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে অভিযান কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে এই নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত নয়; রয়টার্সের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সময় হিসেবে কয়েক সপ্তাহের কথা বলা হয়েছে। 

গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুতিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা, ধুবাব এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশের বেশ কিছু এলাকা দখল করে। পরে তারা প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপেও অবস্থান নেয়। এর ফলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তাদের সামরিক প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। 

বাব আল-মান্দাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এর মাধ্যমে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। প্রণালিটি অস্থিতিশীল হলে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ বিকল্প পথে ঘুরিয়ে নিতে হতে পারে, যার ফলে পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং জ্বালানির বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাতেও বাব আল-মান্দাব ও আশপাশের সমুদ্রপথে হুতিদের হুমকির কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, হুতিরা সৌদি-সম্পৃক্ত জাহাজের বিরুদ্ধে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে এবং পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূল ও কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। 

সৌদি আরব এরই মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। গত ২ অক্টোবর ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমান তাইজ প্রদেশে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে ২০টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় হুতিদের যোদ্ধা, যানবাহন ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। একই সময়ে সৌদি আরব হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান হামলার অভিযোগ তুলেছে। 

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় অংশ না নিলেও সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা করছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন সামরিক অভিযানের বাইরে পুরোপুরি নেই। বরং তারা এমন এক অবস্থান নিয়েছে, যেখানে সৌদি বাহিনীকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে, কিন্তু মার্কিন যুদ্ধবিমান দিয়ে সরাসরি হামলা চালানো হচ্ছে না। 

এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। সেপ্টেম্বরেও সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের অনুরোধ করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সেই হামলার অনুমোদন দেননি। অ্যাক্সিওসের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব ইয়েমেনে সম্ভাব্য হামলার বিকল্প প্রস্তুত করলেও শেষ মুহূর্তে অভিযান স্থগিত করা হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রের এই সতর্কতার পেছনে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইয়েমেনে সরাসরি মার্কিন হামলা শুরু হলে হুতিরা বাব আল-মান্দাবকে আরও কঠোরভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল আরও ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৃহত্তর সংঘাত নতুন একটি সামরিক ফ্রন্ট পেতে পারে।

এদিকে সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ নয়। ইরানের সঙ্গে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ হারানো রিয়াদের জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর চাপের মধ্যে লোহিত সাগরের পথও যদি অনিরাপদ হয়ে যায়, তাহলে সৌদি জ্বালানি রপ্তানি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। 

পরিস্থিতির মানবিক দিকও উদ্বেগজনক। নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে ইয়েমেনে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর অনেক পরিবার খাদ্য সংকটে পড়েছে এবং সংঘাত বাড়লে খাদ্য সরবরাহ ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইয়েমেনের বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সমুদ্রপথে অস্থিরতা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। 

সৌদি আরব এখন বাব আল-মান্দাব পুনর্দখলের জন্য বড় সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে এটি নির্ভরযোগ্য একাধিক প্রতিবেদনে সমর্থিত। তবে অভিযান ঠিক কয়েক দিনের মধ্যে শুরু হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দুই সপ্তাহে দুই শতাধিক লক্ষ্যবস্তু দিয়েছে এই দাবির সব অংশ একই মাত্রায় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। নিশ্চিত তথ্য হলো, ওয়াশিংটন সৌদিকে গোয়েন্দা ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করছে, কিন্তু সরাসরি বিমান হামলায় অংশ নেওয়া থেকে আপাতত বিরত রয়েছে। ফলে সামনে সৌদি বাহিনীর অভিযান কতটা সফল হয় এবং হুতিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপর লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর