ব্রাজিলের ভোটে লুলা বনসোনারো লড়াই ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে বাড়ছে হস্তক্ষেপের তীব্র অভিযোগ

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা ও ফ্লাভিও বনসোনারোর তীব্র লড়াইয়ের মাঝে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব নিয়ে উঠেছে সার্বভৌমত্ব ও হস্তক্ষেপের গুরুতর প্রশ্ন।

ব্রাজিলের ভোটে লুলা বনসোনারো লড়াই ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে বাড়ছে হস্তক্ষেপের তীব্র অভিযোগ

ব্রাজিলের ভোটে লুলা বনসোনারো লড়াই ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে বাড়ছে হস্তক্ষেপের তীব্র অভিযোগ


ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট আগামী ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশটির এই নির্বাচন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, আমাজন বনাঞ্চল এবং পুরো দক্ষিণ আমেরিকার রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভোটের ঠিক আগে নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। 

তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, বিদেশি প্রভাবের অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয়। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, যার ভিত্তিতে বলা যায় যে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি ব্রাজিলের ভোটের ফল নিয়ন্ত্রণ করছে। বরং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ব্রাজিলের বিচারব্যবস্থা নিয়ে চাপ, কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ—এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হস্তক্ষেপের অভিযোগ জোরালো হয়েছে। 

এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বনসোনারোর ছেলে ও সিনেটর ফ্লাভিও বনসোনারোর মধ্যে। জইর বনসোনারো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে ফ্লাভিও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে লুলা চতুর্থবারের মতো, তবে টানা নয়, প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। 

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে লুলা প্রথম দফায় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান খুব বেশি নয়। তথ্যফোলহার সর্বশেষ জরিপে বৈধ ভোটের হিসাবে লুলার সমর্থন ৪৫ শতাংশ এবং ফ্লাভিওর ৪০ শতাংশ। তবে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে লুলা ৪৮ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৪৫ শতাংশে রয়েছেন, যা জরিপের ত্রুটিসীমার কারণে কার্যত ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্য একটি সাম্প্রতিক জরিপে দ্বিতীয় দফায় দুজনকেই ৪২ শতাংশ সমর্থন দেখানো হয়েছে। 

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন চলতি বছরে ব্রাজিলের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেছে। ওয়াশিংটন এর পক্ষে বাণিজ্যিক ও নীতিগত কারণ দেখালেও লুলা অভিযোগ করেছেন, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। কারণ ফ্লাভিও বনসোনারো এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং ফ্লাভিও প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। 

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের নির্বাচনে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন। গত মাসে মার্কিন কংগ্রেসের ৩১ জন গণতন্ত্রী সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি দিয়ে ব্রাজিলের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা শুল্ক, কূটনৈতিক চাপ এবং ব্রাজিলের ভোটব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার উদ্যোগসহ কয়েকটি পদক্ষেপকে বৃহত্তর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। 

আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থায়নের একটি অভিযোগ ঘিরে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন মানবাধিকার তহবিলের অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডানপন্থী ও বামবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল এবং ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালতকে দুর্বল করার লক্ষ্যে অর্থ বরাদ্দের অভিযোগও সামনে এসেছে। ব্রাজিলের অ্যাটর্নি জেনারেল জর্জে মেসিয়াস বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তবে এই অর্থ সরাসরি নির্বাচনের ফল পরিবর্তনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এমন প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। 

নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলে নিজেদের কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ এর কারণ হিসেবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। ব্রাজিলের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে তদন্তের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়াও একই ধরনের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন পর্যন্ত ওই হুমকির সঙ্গে কোনো নির্বাচনী ষড়যন্ত্রের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণিত হয়নি। 

অন্যদিকে ট্রাম্প নিজে এখন পর্যন্ত ফ্লাভিও বনসোনারোকে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেননি। সাম্প্রতিক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, তিনি ব্রাজিলের নির্বাচন খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং বনসোনারো পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে ব্রাজিলে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। 

লুলা বারবার বলেছেন, ব্রাজিলের নির্বাচন ব্রাজিলের জনগণের নিজস্ব বিষয় এবং কোনো বিদেশি শক্তিকে দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব এবং নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষা করা। 

এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট। জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ ও মাদকচক্র, কর্মসংস্থান, সরকারি ব্যয়, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক নীতি ভোটারদের কাছে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। লুলা সামাজিক নিরাপত্তা ও আয়বৈষম্য কমানোর নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফ্লাভিও কঠোর আইনশৃঙ্খলা, কর কমানো এবং তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। 

ফলাফল শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একই দিনে নিম্নকক্ষের সব আসন, উচ্চকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ আসন, রাজ্য গভর্নর এবং বিভিন্ন রাজ্যের আইনসভা নির্বাচনও হবে। ফলে কংগ্রেসে কোন রাজনৈতিক শক্তি কতটা প্রভাবশালী হবে, সেটিও নতুন প্রেসিডেন্টের শাসন পরিচালনার সক্ষমতা নির্ধারণ করবে। 

তথ্য যাচাইয়ের ভিত্তিতে বলা যায়, ব্রাজিলের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গুরুতর ও নথিভুক্ত অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সরাসরি ভোট কারচুপি বা নির্বাচনের ফল নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। আগামী ৪ অক্টোবরের ভোট তাই শুধু লুলা ও ফ্লাভিও বনসোনারোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি ব্রাজিল কতটা স্বাধীনভাবে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে, সেই প্রশ্নেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় অর্ধেকের বেশি বৈধ ভোট না পেলে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হবে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর