ফ্লাইদুবাই হামলার সন্দেহভাজন পাইলটকে আগেই চরমপন্থা নিয়ে সরানো হয়েছিল ওমান থেকে
তেলআবিবগামী উড়োজাহাজে সহপাইলটের হামলার পর পুরোনো চরমপন্থা-সংক্রান্ত সতর্কতা নিয়ে নতুন করে উঠেছে নিরাপত্তা প্রশ্ন।
ফ্লাইদুবাই হামলার সন্দেহভাজন পাইলটকে আগেই চরমপন্থা নিয়ে সরানো হয়েছিল ওমান থেকে
তেলআবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে সহপাইলটের হামলার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে তার অতীত কর্মজীবন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হামলার সন্দেহভাজন ওমানি নাগরিক ওই সহপাইলটকে গত বছর ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থার একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার কথিত চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগের কারণেই তাকে প্রশিক্ষণ থেকে সরানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে তাকে পুরোপুরি বিমান চলাচল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তথ্য এক নয়।
ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ সেপ্টেম্বর। দুবাই থেকে তেলআবিবের উদ্দেশে যাত্রা করা ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় ককপিটে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সহপাইলট পাইলটের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করেন। এতে উড়োজাহাজটি আকস্মিকভাবে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। গুরুতর আহত অবস্থাতেও প্রধান পাইলট ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রী ও উড়োজাহাজে থাকা অন্য পাইলটরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে উড়োজাহাজটি সৌদি আরবের তাবুক শহরে জরুরি অবতরণ করে।
উড়োজাহাজটিতে ১৭৪ জন যাত্রী এবং আটজন কর্মীসহ মোট ১৮২ জন ছিলেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রাথমিক তদন্তে প্রথম কর্মকর্তা বা সহপাইলটের সঙ্গে প্রধান পাইলটের সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। আহত দুই পাইলটকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে তাদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, অতীতে যার আচরণ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তিনি কীভাবে আবার বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ পেলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থায় তাকে প্রশিক্ষণ থেকে সরিয়ে অন্য একটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, তার কথিত চরমপন্থী মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন এবং ঘটনার আগে সেখানে প্রায় আট মাস কাজ করেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আরও একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সন্দেহভাজন ওমানি নাগরিক সংযুক্ত আরব আমিরাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ওমানি এবং মা সিরীয় বলে সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তার জীবনের একটি বড় সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে কেটেছে বলেও জানা গেছে। এর আগে তিনি মরক্কোর জাতীয় বিমান সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেছিলেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য এখন তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ তার কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো নিরাপত্তা সতর্কতা এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে জানানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, সন্দেহভাজন সহপাইলট ইসলামপন্থী চরমপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছেন, ওই ব্যক্তির মধ্যে আত্মঘাতী প্রবণতার লক্ষণ ছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং হামলার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যসহ বিভিন্ন দিক তদন্ত করা হচ্ছে।
এ কারণে ‘চরমপন্থী মতাদর্শই হামলার নিশ্চিত কারণ’ এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া সমীচীন নয়। একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা তিনি একা কাজ করেছিলেন, নাকি অন্য কারও সহায়তা বা প্ররোচনা ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বে তদন্তে সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরের ঝুঁকি। সাধারণত ককপিটের দরজা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বাইরের কেউ সহজে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু একই ব্যবস্থা ককপিটের ভেতরে থাকা কোনো কর্মী হুমকি হয়ে উঠলে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পাইলটদের মানসিক অবস্থা, অতীত আচরণ এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সতর্কতার তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়।
এদিকে আহত প্রধান পাইলটের সাহসিকতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার হাসপাতাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কথোপকথনে জানান, গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি উঠে না দাঁড়ালে উড়োজাহাজের যাত্রীদের জীবন বিপন্ন হবে। তিনি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হলে যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং অন্য পাইলটরা উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করা হয়।