চীনের চাপের মুখে তাইওয়ানে পৌঁছাল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান, বাড়ল প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
চীনের সামরিক চাপের মধ্যে তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নতুন এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান পৌঁছে বাড়িয়েছে আকাশ প্রতিরোধ সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার উদ্বেগ তীব্র।
চীনের চাপের মুখে তাইওয়ানে পৌঁছাল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান, বাড়ল প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
তাইওয়ানের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, প্রথম দুটি যুদ্ধবিমান ৬৭২৭ ও ৬৭২৮ নম্বরের। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রথমে হাওয়াই, পরে গুয়ামে যায়। এরপর একাধিকবার আকাশে জ্বালানি নেওয়ার মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে ২ অক্টোবর দুপুরের দিকে তাইওয়ানে পৌঁছে। বিমান দুটি বর্তমানে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই যুদ্ধবিমান সরবরাহকে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনের সামরিক বাহিনী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ান ঘিরে নিয়মিত বিমান ও নৌ তৎপরতা বাড়িয়েছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি। তাইওয়ান অন্যদিকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিজেদের জনগণের হাতে রয়েছে বলে অবস্থান নিয়ে আসছে।
নতুন যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ হলো এফ-১৬ পরিবারের উন্নত সংস্করণ, যাতে উন্নত বায়ু-অনুসন্ধান ব্যবস্থা, আধুনিক বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য পুরোনো যুদ্ধবিমানের তুলনায় পাইলটকে আকাশে দ্রুত পরিস্থিতি শনাক্ত ও প্রতিক্রিয়া জানাতে সহায়তা করে।
তাইওয়ান ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৬৬টি নতুন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমান কেনার অনুমোদন পায়। পুরো চুক্তির মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী সরবরাহ কয়েক বছর আগেই শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কারিগরি সমস্যা, উৎপাদন পুনর্বিন্যাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা জটিলতার কারণে তা পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রথম দুটি যুদ্ধবিমান তাইওয়ানের মাটিতে পৌঁছাল।
সরবরাহ বিলম্ব নিয়ে তাইওয়ানের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে প্রথম দুটি যুদ্ধবিমান দীর্ঘ সময় হাওয়াইয়ে অবস্থান করায় নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু গত মাসে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং বিদ্যমান চুক্তির নীতিতে পরিবর্তনের কোনো তথ্য তাইপেই পায়নি।
প্রথম দুটি যুদ্ধবিমান তাইওয়ানে পৌঁছানোর পর দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সবগুলো যুদ্ধবিমান সরবরাহ সম্পন্ন হলে তাইওয়ানের এফ-১৬ বহরের সংখ্যা দুই শতাধিকের বেশি হবে। এর ফলে চীনের আধুনিক যুদ্ধবিমান, বিশেষ করে উন্নত ক্ষমতাসম্পন্ন জে-২০ যুদ্ধবিমানের মোকাবিলায় তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু নতুন যুদ্ধবিমান পেলেই তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে বদলে যাবে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। চীনের সামরিক সক্ষমতা তাইওয়ানের তুলনায় অনেক বড় এবং বেইজিংয়ের হাতে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌযান ও অন্যান্য সামরিক ব্যবস্থা রয়েছে। তাইওয়ানের কৌশল হচ্ছে উন্নত অস্ত্র, নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অংশীদারদের সামরিক সহায়তার সমন্বয়ে সম্ভাব্য আক্রমণের খরচ বাড়ানো।
এই সরবরাহের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে মার্কিন আইনে সহায়তার কাঠামো রয়েছে। ফলে তাইওয়ানে নতুন যুদ্ধবিমান পৌঁছানোকে শুধু সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ হিসেবে নয়, বরং তাইপেইয়ের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে চীন বরাবরই তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করে আসছে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এ ধরনের সামরিক সহায়তা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায় এবং চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। ফলে নতুন যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ালেও একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন উত্তেজনার কারণ হতে পারে।
তাইওয়ানের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এখনো এই কর্মসূচির আওতায় আরও যুদ্ধবিমান প্রস্তুত হচ্ছে এবং পরবর্তী ধাপে সেগুলো সরবরাহ করা হবে। নতুন যুদ্ধবিমান গ্রহণের পাশাপাশি তাইওয়ানি পাইলট ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণও চলছে। লক্ষ্য হলো ধাপে ধাপে নতুন যুদ্ধবিমানগুলোকে কার্যকর যুদ্ধ ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পূর্ণ সক্ষমতা গড়ে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রথম দুটি নতুন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমান পাওয়া তাইওয়ানের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি প্রতিরক্ষা অগ্রগতি। তবে এর প্রভাব শুধু তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যকার সামরিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই সরবরাহ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তাইওয়ান ঘিরে সামরিক চাপ বাড়তে থাকায় নতুন যুদ্ধবিমানগুলো সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর জন্য কতটা কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে, সেটিই এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।