কালিনিনগ্রাদে হামলা হলে রাশিয়া সব অস্ত্র ব্যবহারের নতুন করে হুঁশিয়ারি দিলেন পুতিন

কালিনিনগ্রাদে সরাসরি হামলা হলে দেশের হাতে থাকা সব অস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্ন উঠবে বলে পুতিন সতর্ক করেছেন, বাড়ছে রাশিয়া ন্যাটো উত্তেজনা।

কালিনিনগ্রাদে হামলা হলে রাশিয়া সব অস্ত্র ব্যবহারের নতুন করে হুঁশিয়ারি দিলেন পুতিন

কালিনিনগ্রাদে হামলা হলে রাশিয়া সব অস্ত্র ব্যবহারের নতুন করে হুঁশিয়ারি দিলেন পুতিন


রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোটের মধ্যে উত্তেজনার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত কালিনিনগ্রাদ। রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলটি একদিকে পোল্যান্ড, অন্যদিকে লিথুয়ানিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। ফলে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রাশিয়ার জন্য এটি যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, তেমনি সংঘাতের পরিস্থিতিতে অঞ্চলটি রুশ বাহিনীর জন্য একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করে। 

১ অক্টোবর মস্কোয় ভালদাই আলোচনা সভার পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ে চলে যাবে। কালিনিনগ্রাদ বা রাশিয়ার অন্য কোনো ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে দেশের হাতে থাকা সব অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি অনিবার্যভাবে সামনে আসবে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাবনাও স্পষ্টভাবে আলোচনায় আসে। 

পুতিন একই সঙ্গে দাবি করেন, রাশিয়ার ইউরোপের কোনো দেশ আক্রমণের পরিকল্পনা নেই এবং মস্কো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায়। তবে কোনো পক্ষ রাশিয়ার ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা চালালে তার জবাব দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের কাঠামো ছিল মূলত প্রতিরোধমূলক সতর্কবার্তা রাশিয়া প্রথমে ইউরোপে যুদ্ধ শুরু করবে না, কিন্তু রুশ ভূখণ্ড আক্রান্ত হলে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। 

এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে গত কয়েক দিনের কূটনৈতিক উত্তেজনা। রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়া সম্প্রতি পশ্চিমা সামরিক জোটকে একটি কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে। সেখানে কালিনিনগ্রাদকে বিচ্ছিন্ন করার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে রাশিয়া পারমাণবিক প্রতিরোধের পথে যেতে পারে এমন সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। সামরিক জোটটি ওই বার্তার জবাবে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং পারমাণবিক হুমকিকে উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক নয় বলে জানিয়েছে। 

কালিনিনগ্রাদের গুরুত্ব শুধু ভৌগোলিক কারণে নয়। অঞ্চলটিতে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা রয়েছে। বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থানের কারণে এখান থেকে রাশিয়া উত্তর ইউরোপের বিস্তৃত এলাকায় সামরিক প্রভাব বজায় রাখতে পারে। আবার অঞ্চলটি রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি স্থলপথে যুক্ত নয়। ফলে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে মস্কোর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। এই দ্বৈত বাস্তবতার কারণেই কালিনিনগ্রাদকে রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোটের সম্ভাব্য সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। 

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বাল্টিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর পারস্পরিক অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। মস্কো পশ্চিমা সামরিক মহড়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ধারাবাহিক সতর্কবার্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ফলে ভুল হিসাব বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক ঘটনা দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। 

পুতিনের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর সতর্কতা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাতে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ ক্রমে আরও কঠোর হতে থাকলে এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব, যেখান থেকে আর ফিরে আসা কঠিন হবে। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর হাতে এমন অস্ত্র রয়েছে, যা ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তাঁর এই বক্তব্য একই সঙ্গে পশ্চিমের উদ্দেশে হুমকি এবং বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর সতর্কবার্তা দুইভাবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। 

এদিকে পশ্চিমা সামরিক জোটের পক্ষ থেকে কালিনিনগ্রাদ দখল বা সরাসরি আক্রমণের কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন কোনো দাবি যে পশ্চিমা সামরিক জোট কালিনিনগ্রাদে হামলা শুরু করেছে বা হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা এই মুহূর্তে সত্য নয়। যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখনো মূলত হুমকি, পাল্টা সতর্কতা এবং সামরিক প্রস্তুতি ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনার পর্যায়ে রয়েছে। 

সব মিলিয়ে, পুতিনের বক্তব্যকে তাৎক্ষণিক রুশ হামলার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি কালিনিনগ্রাদকে কেন্দ্র করে মস্কোর সবচেয়ে কঠোর সামরিক সতর্কবার্তাগুলোর একটি। বিশেষ করে ‘সব অস্ত্র’ ব্যবহারের কথা বলায় পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে ইউরোপে রাশিয়ার আক্রমণের পরিকল্পনা নেই এই বার্তাও ছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কালিনিনগ্রাদকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা যেন সরাসরি রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোটের সংঘাতে রূপ না নেয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর