দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক ছাড়ল মার্কিন বাহিনী, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনারাও চলে গেছে। বিদায়ে স্বস্তি ও উদ্‌যাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তা, ইরানপন্থী গোষ্ঠী ও আইএসের সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক ছাড়ল মার্কিন বাহিনী, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

দুই দশকের বেশি সময় পর ইরাক ছাড়ল মার্কিন বাহিনী, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ


দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সেনাদেরও প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন বাহিনী ইরাকের সর্বশেষ ঘাঁটি থেকেও বেরিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের পর ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। শেষ পর্যায়ে মার্কিন সেনাদের একটি বড় অংশ উত্তর ইরাকের কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ইরবিলের একটি বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছিল।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের অনেক মানুষ জাতীয় সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাগদাদসহ বিভিন্ন এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায়কে কেন্দ্র করে উদ্‌যাপনও হয়েছে। ইরাকের জন্য এটি এমন একটি সময়, যখন দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব আরও বেশি নিজস্ব বাহিনীর ওপর এসে পড়ছে। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির শেষ পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা করা। গত এক দশকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সহায়তায় আইএস ইরাকের বিশাল এলাকা থেকে উৎখাত হয়েছে। তবে গোষ্ঠীটির কিছু সদস্য ও গোপন নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় থাকার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর ইরাকের নিজস্ব নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা দিয়ে এসব সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা কতটা কার্যকরভাবে করা যাবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ইরাকের কিছু কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে বিমান শক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইরাকের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে মন্তব্য এসেছে। ফলে মার্কিন বাহিনীর প্রত্যাহারের পর সরাসরি কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা না থাকলেও, দেশটির নিজস্ব বাহিনীর সক্ষমতার ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্ব পড়বে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা। দীর্ঘদিন ধরে এসব গোষ্ঠী ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রভাবশালী। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান ও তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু গোষ্ঠী নিজেদের জন্য কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইরাকের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে—এমন বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। তবে সেনা প্রত্যাহার নিজেই যে এসব গোষ্ঠীর ক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

মার্কিন বাহিনীর বিদায়ের ফলে ইরাকের আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। গত দুই দশকে ইরাক অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর বাগদাদকে একদিকে নিজস্ব নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করতে হবে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। একই সময়ে ইরাকের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও মোকাবিলা করতে হবে।

তবে মার্কিন সেনা চলে যাওয়াকে সরাসরি ইরাকে নতুন নিরাপত্তাশূন্যতা বা আইএসের নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের সূচনা বলা ঠিক হবে না। এগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি, যার বাস্তবতা নির্ভর করবে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা, গোয়েন্দা কার্যক্রম, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপর। বর্তমানে সবচেয়ে নিশ্চিত বিষয় হলো—ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটেছে এবং নিরাপত্তার বড় দায়িত্ব এখন ইরাকের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে।

ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিবর্তন। একদিকে এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বহু মানুষের প্রত্যাশাকে প্রতিফলিত করেছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন ইরাক কতটা কার্যকরভাবে নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামো পরিচালনা করতে পারে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আইএসের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে—তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতির বড় অংশ নির্ভর করবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর