ইরানের পরমাণু অস্ত্রের পক্ষে জ্যাকসন হিঙ্কল, মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক
ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার জ্যাকসন হিঙ্কল। তাঁর মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের পরমাণু অস্ত্রের পক্ষে জ্যাকসন হিঙ্কল, মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক
ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তি জ্যাকসন হিঙ্কল। সাম্প্রতিক এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি সরাসরি লিখেছেন, তিনি ইরানের পরমাণু অস্ত্র থাকার বিষয়টিকে সমর্থন করেন। তাঁর এই বক্তব্য সামনে আসার পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং পরমাণু বিস্তার নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনলাইনে থাকা পোস্টের রেকর্ড থেকে হিঙ্কলের বক্তব্যটি যাচাই করা যায়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হিঙ্কল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনো কর্মকর্তা নন এবং তাঁর বক্তব্যকে ওয়াশিংটনের সরকারি নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য অবস্থান এর বিপরীত। ২৯ সেপ্টেম্বরের এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র পাবে না। এর আগে জুনেও হোয়াইট হাউস ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
হিঙ্কলের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাঁর দীর্ঘদিনের ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত রাজনৈতিক অবস্থানের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি ইরানে গিয়ে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানকার একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানেও অংশ নিতে দেখা যায়। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মূল কারণ দেশটির ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ জানিয়েছে, ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ যাচাই কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পর্কে সংস্থাটির কাছে আগের মতো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯০ শতাংশ মাত্রার নিচে, তবে এত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণ আন্তর্জাতিকভাবে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকা মানেই কোনো দেশের কাছে প্রস্তুত পরমাণু অস্ত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও সরাসরি টানা যায় না।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি সাত দিনের আস্থাবর্ধক পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। পরিকল্পনাটির সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ও যুক্ত রয়েছে। তবে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে এখনো বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
ইরান বলছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে নয় এবং তারা নিজেদের পরমাণু কর্মসূচির অধিকার ছাড়তে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে হিঙ্কলের ব্যক্তিগত সমর্থনের বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থান—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
ইরান যদি ভবিষ্যতে সত্যিই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো ও পরমাণু বিস্তার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অন্যান্য আঞ্চলিক রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে আলোচিত। তবে বর্তমানে ইরান পরমাণু অস্ত্র অর্জন করেছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
জ্যাকসন হিঙ্কলের ইরানের পরমাণু অস্ত্র সমর্থনের বক্তব্যটি সত্যিই তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এটিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতি পরিবর্তন, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কিংবা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। বরং বক্তব্যটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা ও মতবিরোধ—দুটিই পাশাপাশি চলছে।