ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় কাতারের গ্যাস বিক্রিতে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি
যুদ্ধ ও হরমুজ সংকটে কাতারের এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমেছে। ছয় মাসে গ্যাস বিক্রির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে।
ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় কাতারের গ্যাস বিক্রিতে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির দীর্ঘস্থায়ী সংকটে কাতারের এলএনজি রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাসে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে যায়। এর ফলে স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় কাতারের গ্যাস বিক্রিতে আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে এই অর্থকে সরাসরি কাতার সরকারের বাজেট ক্ষতি হিসেবে দেখানো যাবে না; এটি মূলত কমে যাওয়া গ্যাস বিক্রির আনুমানিক মূল্য।
যুদ্ধের আগে কাতার বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ ছিল। বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের বড় একটি অংশ কাতার থেকে আসত এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ দেশটির গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
রয়টার্সের আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো পাঠাতে পেরেছিল। এর আগের বছরের একই সময়ে দেশটি ৫০৯টি কার্গো পাঠিয়েছিল। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রপথে গ্যাস পরিবহনও বড় বাধার মুখে পড়ে।
এর আগে মার্চে কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলের এলএনজি অবকাঠামোয় হামলার পর কাতারএনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবি জানিয়েছিলেন, দেশটির এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুটি এলএনজি ট্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বছরে প্রায় ১২ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন রপ্তানি সক্ষমতা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুরোপুরি মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও তখন জানানো হয়েছিল।
তবে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি শুধু ওই অবকাঠামোগত ক্ষতির ফল নয়। হরমুজ প্রণালির সংকটও কাতারের গ্যাস রপ্তানিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। কাতারের এলএনজি জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করতে হয়। ফলে প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় অনেক চালান স্থগিত বা বিলম্বিত হয়েছে।
সংকটের প্রভাব এখনো কাতারের দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের ওপর রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কাতারএনার্জি ইতালির এডিসন এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি এশীয় ক্রেতার কাছে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখার সময়সীমা বাড়ানোর কথা জানায়। ফলে কাতার থেকে নিয়মিত গ্যাস না পেয়ে কিছু ক্রেতাকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এর প্রভাব আন্তর্জাতিক গ্যাস বাজারেও পড়েছে। কাতারের মতো বড় সরবরাহকারীর রপ্তানি কমে যাওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে বিকল্প এলএনজি কার্গোর জন্য প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে শীত মৌসুম সামনে থাকায় সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
কাতারের জন্য পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশটির গ্যাস রপ্তানি অবকাঠামোর বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর। ফলে শুধু উৎপাদন স্থাপনা মেরামত করলেই সংকট পুরোপুরি কাটবে না; হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন নৌ চলাচলও নিশ্চিত করতে হবে। এই কারণে কাতার যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত করা এবং হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয় রয়েছে।
তবে কাতারের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমন কোনো তথ্য এই হিসাব থেকে পাওয়া যায় না। দেশটির বড় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, যা সাময়িক জ্বালানি রাজস্বের ধাক্কা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। মূল চাপটি বর্তমানে গ্যাস উৎপাদন, রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সরবরাহ বজায় রাখার ক্ষেত্রে।
২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি কাতারের এলএনজি খাতে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ। এটি সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ নয়। বরং উৎপাদন অবকাঠামোর ক্ষতি, হরমুজ প্রণালির সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সম্মিলিত ফলে কাতারের সম্ভাব্য গ্যাস বিক্রির যে বড় অংশ হারিয়েছে, সেই হিসাবই এই পরিমাণকে নির্দেশ করে।