তদন্তের মধ্যেই ডিসির বদলি, বিতর্কিত নিয়োগে এখন কার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ?
পটুয়াখালী কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলার মধ্যেই বদলি হয়েছেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। তাঁর বদলির পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বিতর্কিত এই নিয়োগ নিয়ে তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
তদন্তের মধ্যেই ডিসির বদলি, বিতর্কিত নিয়োগে এখন কার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ?
চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি মোসা. শাহানারা আক্তারকে পটুয়াখালী কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী।
নিয়োগের পর থেকেই শাহানারা আক্তারের যোগ্যতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত তিনি পূরণ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে আপত্তি রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বিজ্ঞপ্তিতে ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়। এ কারণে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, প্রার্থী বাছাই এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষের মতো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দেয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি। শাহানারা আক্তার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বিভিন্ন চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাঁর এনটিআরসিএর নিয়োগ রয়েছে। অন্যদিকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী নিয়োগে অনিয়ম কিংবা ব্যক্তিগত সখ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তৎকালীন জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর মাত্র দুজন প্রার্থী পাওয়া যায় এবং তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করা হয়। প্রয়োজনীয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকায় শাহানারা আক্তারকে স্থায়ীভাবে নয়, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নজরেও আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। তদন্তের মূল বিষয় হচ্ছে—নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না।
এরই মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দেশের কয়েকটি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে পটুয়াখালীর নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে অর্থ বিভাগের উপসচিব চৌধুরী আশরাফুল করিমকে পদায়ন করা হয়। একই সময়ে ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে পদায়নের তথ্য প্রকাশিত হয়।
তবে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের এই বদলির সঙ্গে কালেক্টরেট স্কুলের উপাধ্যক্ষ নিয়োগের তদন্তের সরাসরি কোনো কারণগত সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্য সরকারি পদায়নসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ নেই। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ড. শহীদ হোসেন চৌধুরীসহ কয়েকজন জেলা প্রশাসক উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁদের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটলেও একটিকে অন্যটির সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে নিয়োগ নিয়ে তদন্ত চলার সময়ই নিয়োগপত্রে স্বাক্ষরকারী তৎকালীন জেলা প্রশাসকের বদলি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—তদন্তে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম পাওয়া যায় কি না এবং পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উপাধ্যক্ষ শাহানারা আক্তারের নিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর নিয়োগ বহাল থাকবে কি না, অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর নিয়োগের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে তিনি দায়িত্বে বহাল থাকবেন কি না—এসব বিষয় এখন সংশ্লিষ্টদের নজরে।
পটুয়াখালী কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওয়েবসাইটেও শাহানারা আক্তারকে বর্তমানে উপাধ্যক্ষ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফলে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের বদলির পরও উপাধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। বরং এখন সবার নজর তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়—সেটিই এখন এই নিয়োগ বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।